মে দিবসের চেতনা ও ইসলামে শ্রমিকের অধিকার | Daily AjKaler Kontho

মে দিবসের চেতনা ও ইসলামে শ্রমিকের অধিকার


মোসাদ্দেক হোসেন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় : প্রকাশের সময় : মে ১, ২০২৬, ২:২৯ অপরাহ্ন
মে দিবসের চেতনা ও ইসলামে শ্রমিকের অধিকার

যুগ যুগ ধরে সভ্যতার চাকা সচল রেখেছে যে মেহনতি মানুষ, তাদের ইতিহাস কেবলই বঞ্চনা আর রক্ত ঝরার। রোদে পুড়ে; বৃষ্টিতে ভিজে তিল তিল করে তারা গড়ে তোলে আকাশচুম্বী অট্টালিকা, অথচ দিনশেষে তাদের নিজেদেরই মাথা গোঁজার ঠাঁই জোটে না পুঁজিবাদী সমাজে। পুঁজিপতিদের মুনাফার পাহাড় যাদের হাড়ভাঙা খাটুনির ওপর দাঁড়িয়ে, সভ্যতার সেই কারিগররাই বরাবর থেকেছে শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে। নিভৃতে যুগের পর যুগ ঘাম ঝরানো এই মানুষগুলোর দীর্ঘশ্বাস আর অধিকারের নিশ্চয়তা যেন কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে শ্রমিকের জীবন ওষ্ঠাগত এবং ন্যায্য মজুরি নিয়ে রাজপথে হাহাকার চলছে, তখন মে দিবসের রক্তঝরা ইতিহাস আর ইসলামের শাশ্বত শ্রমনীতির বাস্তবায়ন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বলাটা অবাঞ্ছনীয় হবে না।

‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ অর্থাৎ মহান ‘মে দিবস’। মে দিবসে এ বছরের প্রতিপাদ্য “সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত”— অন্তর্নিহিত প্রেরণাকে ধারণ করেই বিশ্বের সকল দেশের সাথে বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে মহান ‘মে দিবস’।

এদিন ১৮৮৬ সালে (১লা মে) আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল; তা ছিল শ্রমিকের মানবিক অধিকার রক্ষার এক চূড়ান্ত লড়াই। মালিকপক্ষের লেলিয়ে দেওয়া পুলিশ ও ভাড়াটিয়া গুন্ডাদের গুলিতে রাজপথ রঞ্জিত করে শহীদ হয়েছিলেন শ্রমিক নেতা স্পাইজ, পার্সন্স ও ফিশার-সহ আরও অনেকে। তখন থেকেই আজকের দিনটি শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে পালিত হয়।

তবে, এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের কয়েক শতাব্দী পূর্বেই ইসলাম পৃথিবীর বুকে শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদার সর্বশ্রেষ্ঠ সনদ ঘোষণা করা হয়েছে।পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কাসাসের ২৬ নম্বর আয়াতে একজন আদর্শ শ্রমিকের গুণাবলি বর্ণনা করে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আপনার মজুর হিসেবে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।”

এছাড়া সূরা জুমুআ’র ১০ নম্বর আয়াতে সালাত শেষে জীবিকা অন্বেষণে জমিনে ছড়িয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা শ্রমকে ইবাদত হিসেবে মহিমান্বিত করেছেন।ইসলামে শ্রমিকের সবচেয়ে বড় অধিকার হলো তার ন্যায্য মজুরি সময়মতো পাওয়া। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঐতিহাসিক ঘোষণা হলো, “তোমরা শ্রমিককে তার শরীরের ঘাম শুকানোর পূর্বেই পারিশ্রমিক দিয়ে দাও” (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৪৪৩)।

শ্রমিকের মর্যাদা এতটাই যে, স্বহস্তের উপার্জনকে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করে বুখারি শরীফের ২০৭৫ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, “কারো জন্য স্বহস্তের উপার্জন অপেক্ষা উত্তম আহার্য আর নেই।” ইসলাম মালিক ও শ্রমিকের মাঝে কোনো কৃত্রিম দেয়াল রাখেনি। সহিহ বুখারির ৩০ নম্বর হাদিসে রাসূল (সা.) কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে, শ্রমিকরা তোমাদের ভাই, আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্থ করেছেন; সুতরাং তোমরা যা খাবে তাদের তা-ই খাওয়াবে এবং যা পরিধান করবে তাদের তা-ই পরাবে।

আজকের পুঁজিবাদী সমাজে যখন মালিকরা শ্রমিকের পাওনা আটকে রেখে বিলাসিতা করে, তখন ইসলামের হুঁশিয়ারি অত্যন্ত প্রকম্পিত। বুখারি শরীফের ২২২৭ নম্বর হাদিসে মহান আল্লাহ বলেন, “কেয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির প্রতিপক্ষ হব। তাদের একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে কোনো শ্রমিক নিয়োগ করে তার থেকে পূর্ণ কাজ আদায় করে নেয়, কিন্তু তার ন্যায্য পারিশ্রমিক দেয় না।”

আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও পুঁজিবাদের আগ্রাসনে মালিক-শ্রমিকের বৈরী সম্পর্ক দিন দিন বেড়েই চলেছে। উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যে শ্রমিক মালিকের অর্থযন্ত্র সচল রাখে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সেই শ্রমিকের নিজের সংসারই আজ অচল। শোষণ আর বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে কেবল ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা ও শ্রমনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই ঘামে ভেজা এই দেশীয় কারিগরদের জীবনে প্রকৃত শান্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

বর্তমান মে দিবসে কেবল পুঁজিবাদী স্লোগান বা আনুষ্ঠানিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ না থেকে যদি কুরআন ও হাদিসের এই সুস্পষ্ট নীতিমালা বাস্তবায়ন করা যায়, তবেই বাংলাদেশের প্রতিটি কল-কারখানা ও কর্মক্ষেত্রে শান্তি ফিরে আসবে। শ্রমিকের ঘাম আর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধি তখনই সার্থক হবে, যখন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলামী শ্রমনীতির পূর্ণ প্রতিফলন ঘটবে।

আজকালের কন্ঠ/আর এস