
প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলে যখন কৃষি ও মৎস্যখাতে নেমেছে স্থবিরতা, তখন আশার আলো দেখাচ্ছেন মদন উপজেলার কুটুরীকোণা গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা আমিনুল ইসলাম। সনাতনী পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চা ফুটিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন লাভজনক এক উদ্যোগ। তার দেখাদেখি গ্রামের অনেকেই এখন এই কাজে যুক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। ফলে কর্মসংস্থানের নতুন পথ তৈরি হয়েছে, কমেছে শহরমুখী মানুষের চাপ। হাওরপাড়ের এই উদ্যোগ এখন হয়ে উঠেছে সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, ঐতিহ্যবাহী এই পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করে কুটুরীকোণা গ্রাম এখন হাওরপাড়ে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরীসহ নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলের পাঁচটি উপজেলায় রয়েছে প্রায় ৫ শতাধিক গ্রাম। বর্ষার ছয় মাস এখানে কাজের তেমন সুযোগ থাকে না। তার ওপর আগাম বন্যা, খরা, নদী-খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতি বিপর্যস্ত। ফলে কাজের খোঁজে অনেকেই শহরমুখী হচ্ছেন।
এই বাস্তবতায় ১৯৯০ সালে কুটুরীকোণা গ্রামের ইদ্রিস মিয়া ১২ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে “নাজাহ হাঁসের খামার ও হ্যাচারি” গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে তার ছেলে আমিনুল ইসলাম সেই উদ্যোগকে বড় পরিসরে এগিয়ে নেন। বর্তমানে তার খামারে প্রায় ৩০ লাখ টাকার বিনিয়োগ রয়েছে এবং এখানে ১২ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে।
গ্রামের অন্যরাও একে একে খামার গড়ে তুলেছেন। প্রতিদিনের একদিন বয়সী হাঁসের বাচ্চা ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়, আর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বাড়ে।
বর্ষায় ছয় মাস কাজ থাকে না। কিন্তু এখন হাঁসের বাচ্চা ফুটিয়ে আমরা আয় করতে পারছি। অন্যরাও দেখে এই কাজে যুক্ত হচ্ছে।
আমিনুল ইসলাম জানান, তার খামার থেকে প্রতি মাসে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা লাভ হচ্ছে।
আমার বাবা ১২ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেছিলেন। এখন আমরা প্রায় ৩০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করছি। দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনলাইন ও অফলাইনে হাঁসের বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে।
গ্রামের ছোট ছোট টিন বা কাঁচা ঘরের ভেতরে তৈরি হ্যাচারিগুলোতে সারি সারি ডিম রাখা হয়। হ্যারিকেনের আলো ও তুষের তাপে তৈরি করা হয় প্রয়োজনীয় উষ্ণ পরিবেশ। বিশেষ কৌশলে ২৭ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে ফুটে ওঠে হাঁসের বাচ্চা। সনাতনী এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত বাচ্চার মৃত্যুহার কম এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হওয়ায় বাজারে এর চাহিদাও বেশি।
দিন-রাত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। ডিম বাছাই করতে হয়। ঠিকভাবে যত্ন নিলে ২৭-২৮ দিনেই বাচ্চা ফুটে।
এখানের হাঁসের বাচ্চা ভালো মানের, রোগ কম হয়। তাই আমরা এখান থেকেই কিনি।”
হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ডিম সংগ্রহ করে কুটুরীকোণা গ্রামের হ্যাচারিতে সরবরাহ করছেন অনেকেই। এতে তাদেরও জীবিকা নির্বাহ সহজ হয়েছে।
বিভিন্ন গ্রাম থেকে ডিম কিনে এখানে এনে বিক্রি করি, এতে সংসার চলে।
এই খামারগুলো শুধু স্থানীয় কর্মসংস্থানই বাড়াচ্ছে না, জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কুটুরীকোণা গ্রামে বছরে প্রায় ৩ কোটি হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন হয়। ফলে আশপাশের গ্রামগুলোতেও গড়ে উঠছে নতুন নতুন হ্যাচারি।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই খাতের উন্নয়নে ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তা আরও বাড়ানো হবে।
আজকালের কন্ঠ/আর বি
আপনার মতামত লিখুন :