
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও কুখ্যাত যৌন অপরাধীদের একজন জেফ্রি এপস্টেইন। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন পাচার, ক্ষমতাবানদের সঙ্গে রহস্যজনক সম্পর্ক এবং বিচার প্রক্রিয়া শুরুর আগেই কারাগারে মৃত্যুর কারণে তার নাম আজও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি উচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে এপস্টেইনের মৃত্যু হয়। সে সময় তিনি জামিনের সুযোগ ছাড়াই যৌন পাচারের মামলায় বিচারাধীন ছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে জানালেও বিষয়টি ঘিরে সন্দেহ ও বিতর্ক এখনো থামেনি।
এর এক দশক আগেই অপ্রাপ্তবয়স্কের কাছ থেকে যৌনসেবা নেওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এপস্টেইন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ তাকে আজীবনের জন্য ‘লেভেল থ্রি’ যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধন করে যা পুনরায় অপরাধ করার উচ্চ ঝুঁকি নির্দেশ করে।
শিক্ষক থেকে কোটিপতি
নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া এপস্টেইন ১৯৭০-এর দশকে শহরের অভিজাত ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন। সেখান থেকে ওয়াল স্ট্রিটে প্রবেশ করে বেয়ার স্টার্নসের অংশীদার হন তিনি। পরে ‘জে এপস্টেইন অ্যান্ড কো’ নামে নিজস্ব বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যা একসময় এক বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ পরিচালনা করত।
অল্প সময়েই তিনি ফ্লোরিডা, নিউইয়র্ক ও নিউ মেক্সিকোতে বিলাসবহুল সম্পত্তির মালিক হন এবং রাজনীতিক, শিল্পী ও ধনকুবেরদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সম্পর্ক
ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন, প্রিন্স অ্যান্ড্রু, হার্ভি ওয়াইনস্টাইনসহ বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এসব সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ নয় বলে দাবি করা হয়।
বিশেষ করে ব্রিটিশ প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে তার সম্পর্ক আন্তর্জাতিক বিতর্ক তৈরি করে। এপস্টেইনের এক অভিযোগকারী ভার্জিনিয়া জিউফ্রে দাবি করেন, ১৭ বছর বয়সে তাকে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে যৌনসম্পর্কে বাধ্য করা হয়েছিল। অভিযোগ অস্বীকার করলেও ২০২২ সালে অ্যান্ড্রু ক্ষতিপূরণ দিয়ে মামলা নিষ্পত্তি করেন।
‘শতাব্দীর সমঝোতা’
২০০৫ সালে ফ্লোরিডায় একাধিক কিশোরীর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে। তদন্তে প্রায় ৫০ জন ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য পাওয়া যায়। তবে ২০০৮ সালে ফেডারেল প্রসিকিউটরদের সঙ্গে একটি বিতর্কিত সমঝোতার মাধ্যমে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ঝুঁকি এড়িয়ে যান। মাত্র ১৮ মাসের সাজা পান, যার বেশিরভাগ সময়ই তিনি ‘ওয়ার্ক রিলিজ’ সুবিধায় কাটান।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম মিয়ামি হেরাল্ড এই চুক্তিকে আখ্যা দেয় ‘শতাব্দীর সমঝোতা’ হিসেবে।

কারাগারে মৃত্যু ও রহস্য
২০১৯ সালে নতুন করে যৌন পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন কারেকশনাল সেন্টারে রাখা হয় এপস্টেইনকে। বিচার শুরু হওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়, যা বহু প্রশ্নের জন্ম দেয়।
ম্যাক্সওয়েল মামলা
এপস্টেইনের মৃত্যুর পর তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল গ্রেপ্তার হন। ২০২১ সালে অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি ২০ বছরের কারাদণ্ড পান। আদালতে ম্যাক্সওয়েল বলেন, এপস্টেইনের সঙ্গে পরিচয় হওয়াই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুতাপ।
নথি প্রকাশ নিয়েও বিতর্ক
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ পাস হলেও এখনো সব নথি প্রকাশ হয়নি। বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অকারণে গোপন রাখা হয়েছে। এপস্টেইনের বিচার কখনো সম্পন্ন না হলেও তার কেলেঙ্কারি, প্রভাব এবং প্রশ্নবিদ্ধ সম্পর্ক বিশ্ব রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থার ওপর গভীর ছাপ রেখে গেছে।
সূত্র: বিবিসি।
আজকালের কন্ঠ/আর বি
আপনার মতামত লিখুন :