দেবিদ্বারে রোপা আমন–সরিষা–বোরো শস্যবিন্যাসে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা | Daily AjKaler Kontho

দেবিদ্বারে রোপা আমন–সরিষা–বোরো শস্যবিন্যাসে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা


শাহ সাহিদ উদ্দিন, কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২৪, ২০২৬, ৪:১০ অপরাহ্ন
দেবিদ্বারে রোপা আমন–সরিষা–বোরো শস্যবিন্যাসে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা

কুমিল্লা দেবিদ্বারে রোপা আমন ধান কাটার পর পতিত পড়ে থাকা জমিতে সরিষা চাষ করে একই জমিতে আবার বোরো আবাদ—এই সফল শস্যবিন্যাস কৃষিতে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। প্রথম বছরেই আশাব্যঞ্জক ফলন পাওয়ায় শস্যের নিবিড়তা বেড়েছে, পাশাপাশি অতিরিক্ত আয় পেয়ে স্বস্তিতে আছেন কৃষকেরা। চলতি মৌসুমে উপজেলায় নতুন করে প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে।

পৌরসভার বড় আলমপুর মাঠ ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় ২০ বিঘা জমিতে সরিষার আবাদ। ফুলে ফুলে মাঠ যেন হলুদ চাদরে মোড়া। দূর থেকেই ভেসে আসে সরিষার মিষ্টি সুঘ্রাণ। মাঠজুড়ে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌমাছির দল—এক কথায় সাজ সাজ রব।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ ও সহায়তায় এবারই প্রথম সরিষা চাষে আগ্রহী হয়েছেন তারা। শুরুতে কিছুটা আশঙ্কা থাকলেও এখন ফলনের সম্ভাবনা দেখে সন্তুষ্ট কৃষকেরা।

বড় আলমপুর এলাকার কৃষক আমিনুল ইসলাম জানান, খরিফ-২ মৌসুমে রোপা আমন কাটার পর সরিষা চাষ নিয়ে উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে আলোচনা সভা হয়। সেখান থেকেই আগ্রহ তৈরি হয়। প্রথমবার ২০ বিঘা জমিতে সরিষা আবাদ করেছেন তিনি। মাঠজুড়ে ফুল দেখে এখন আর কোনো দুশ্চিন্তা নেই। বিকেল হলেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সরিষা ক্ষেতের ছবি তুলতে আসে। আগামী বছর পুরো এলাকায় সরিষা আবাদ বাড়ানোর আলোচনা চলছে।

ফতেহাবাদ ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামে তরুণ কৃষক মারুফ পতিত জমিতে সরিষা আবাদ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি জানান, যে জমিতে একসময় ট্রাক্টর ঢোকানোই কঠিন ছিল, সেখানে এবার প্রথমবার ১২ বিঘা জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। জমি ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় আশপাশের আরও ১০ বিঘা জমিতে শশা, গমসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ সম্ভব হয়েছে।

উপসহকারী কৃষি অফিসার মোছা. নাজমা আক্তারের পরামর্শে প্রথমে ৬ বিঘা জমিতে সরিষা আবাদ শুরু হয়। পরে দেখাদেখি আরও ৬ বিঘা জমিতে চাষ সম্প্রসারিত হয়। একই ইউনিয়নের ফতেহাবাদ গ্রামে এখন ১০০ বিঘারও বেশি জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে সরিষা কাটার পর বোরো আবাদে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কৃষক গ্রুপ গঠন করে শস্যবিন্যাসে সরিষা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বিনা চাষে সরিষা আবাদে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি নতুন জাত সম্প্রসারণ ও ফলন ব্যবধান কমাতে প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে ৫০০ জন কৃষকের জন্য প্রণোদনা কর্মসূচি নেওয়া হয়, যার আওতায় ৪০০ জন কৃষককে সরিষা বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে।

চলতি মৌসুমে দেবিদ্বার উপজেলায় মোট ৩৯৭ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। এতে আনুমানিক ৫ হাজার টন সরিষা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার বাজার মূল্য কমপক্ষে দেড় কোটি টাকা।

উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ বানিন রায় বলেন, “ধানভিত্তিক শস্যবিন্যাসে অভ্যস্ত কৃষকদের মধ্যে সরিষা সম্প্রসারণ চ্যালেঞ্জিং হলেও বোরো–পতিত–রোপা আমন ও বোরো–পতিত শস্যবিন্যাসের জমিতে সরিষা অন্তর্ভুক্ত করে আবাদ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবার প্রথমবার বিনাসরিষা-১১ ও বারি সরিষা-২০ জাতের আবাদ ও বীজ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগামী দিনে সরিষার আবাদ আরও বাড়বে বলে আমরা আশাবাদী।”

রোপা আমনের পর সরিষা, এরপর বোরো—এই তিন ফসলের সমন্বয় দেবিদ্বারের কৃষিতে এনে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা। পতিত জমির সদ্ব্যবহার, বাড়তি আয় ও কৃষকের আগ্রহ—সব মিলিয়ে সরিষা এখন দেবিদ্বারের কৃষিতে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার নাম।

আজকালের কন্ঠ/আর বি