'বুটেক্সে কেমন ক্যাম্পাস চাই: শিক্ষার্থীদের চোখে প্রত্যাশা' | Daily AjKaler Kontho

‘বুটেক্সে কেমন ক্যাম্পাস চাই: শিক্ষার্থীদের চোখে প্রত্যাশা’


বুটেক্সে প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২, ২০২৬, ৫:২৭ অপরাহ্ন
‘বুটেক্সে কেমন ক্যাম্পাস চাই: শিক্ষার্থীদের চোখে প্রত্যাশা’

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় দেশের একমাত্র বিশেষায়িত টেক্সটাইল উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে পড়া শিক্ষার্থীরা মনে করেন—একাডেমিক মানের পাশাপাশি একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক ক্যাম্পাস গড়ে তোলা এখন জরুরি। ইন্ডাস্ট্রি সংযোগ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসম্মত ক্যান্টিন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সুস্থ ক্যাম্পাস কালচার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের রয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও স্পষ্ট প্রত্যাশা। বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে শিক্ষার্থীদের এই প্রত্যাশার কথাগুলো তুলে ধরেছেন নাজমুল ইসলাম।

ইন্ডাস্ট্রি-কানেক্টেড ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক বুটেক্সের প্রত্যাশা

আমি এমন বুটেক্সের স্বপ্ন দেখি, যেখানে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মেধা-মননের বিকাশই হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লক্ষ্য। যেখানে পাঠ্যসূচি শুধু তত্ত্বে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আধুনিক টেক্সটাইল শিল্পের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার্থীদের তৈরি করা হবে। প্রশাসন হবে আরও শিক্ষার্থীবান্ধব, আন্তরিক ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—যারা শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি, একাডেমিক সহায়তা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে।

তাছাড়া “ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশান” এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন নতুন সুযোগ তৈরি এবং বুটেক্সে “ক্যারিয়ার সেন্টার” প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চাকরিবান্ধব দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যাপারে যুগোপযোগী প্রশাসনিক উদ্যোগ প্রত্যাশা করি। বুটেক্সের সাবেক শিক্ষার্থীদের একটা বিশাল অংশ সরাসরি টেক্সটাইল খাতে যুক্ত এবং অনেকেই উচ্চপদস্থ স্থানে রয়েছেন, যাদের সাথে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ সুদৃঢ় করার জন্য ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সেমিনার,ওয়ার্কশপ আয়োজন করা উচিত আগামীতে। এর ফলে টেক্সটাইল খাতের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা আরো সচেতন ও আগ্রহী হবে যা বুটেক্সের জন্য আগামীতে সুফল বয়ে আনবে।

– এফ এম সাজ্জাদ হোসেন, ৪৬তম ব্যাচ, শিক্ষার্থী, ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ।

ক্যাম্পাস–কালচার: একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অদৃশ্য শক্তি

আমি এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় চাই যার নিজস্ব ক্যাম্পাস কালচার ও পরিচয় আছে—যেখানে সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ, ক্লাব-অ্যাকটিভিটি সক্রিয়, এবং শেখার পরিবেশ উৎসাহব্যঞ্জক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠন, ছাত্র সংসদ ও ক্লাবসমূহ একাডেমিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি করবে। ভর্তির শুরু থেকেই ওরিয়েন্টেশন, প্রি-এক্সাম কাউন্সেলিং, ক্যারিয়ার গাইডলাইন প্রোগ্রাম,কমিউনিটি ইন্টিগ্রেশন প্রোগ্রাম শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস জীবনে মানিয়ে নেওয়া ও ভবিষ্যৎ পেশাগত প্রস্তুতিতে সহায়তা করবে।

দায়িত্বশীল সিনিয়রশিপ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত ক্যাম্পাস আইডেন্টিটি গড়ে তোলে। যেখানে সিনিয়ররা জুনিয়রদের পাশে দাঁড়ায়, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়, এবং সম্মান, অংশগ্রহণ ও ঐক্য—এই মূল্যবোধগুলো তাদের হাতে তুলে দেয়। এতে সিনিয়র–জুনিয়র সম্পর্ক ক্ষমতার প্রদর্শন নয়; বরং পারস্পরিক আস্থা ও শেখার সম্পর্ক হয়ে ওঠে।

একটি ক্যাম্পাসের আসল পরিচয় গড়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের আচরণ, একাডেমিক সততা, এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধার মাধ্যমে। আমরা এমন পরিবেশ চাই যেখানে প্রতিটি ব্যাচ আগের ব্যাচের কাছ থেকে মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি গ্রহণ করে—এবং নিজেদের আচরণে সেটিকে আরও সমৃদ্ধ করে। এমন ক্যাম্পাস কালচার শিক্ষার্থীর নেতৃত্ব, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ও পেশাগত প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আমার বিশ্বাস।

– হামিদ আজাদ, শিক্ষার্থী, ৪৮তম ব্যাচ, আ্যপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ।

ছাত্ররাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের আকাঙ্ক্ষা

বর্তমান ও অতীতের বাস্তবতা মূল্যায়ন করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, একসময় ক্যাম্পাস ছিল দলীয় ছাত্রসংগঠনের দখলে—যেখানে সেশনজট, র‍্যাগিং, ভীতি প্রদর্শন ও প্রশাসনিক দুর্নীতির মতো সমস্যায় বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন জর্জরিত ছিল। স্বৈরশাসনের পতন এবং ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যেই সেশনজট প্রায় নির্মূল, র‍্যাগিংসহ ভয়ভীতি সৃষ্টিকারী কার্যক্রম বন্ধ এবং শিক্ষাঙ্গন ফিরে পায় সুশৃঙ্খল ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ।

এই বদলে যাওয়া বাস্তবতা আমাদের উপলব্ধিকে আরও স্পষ্ট করেছে। অতীতের দলীয় দখলদারিত্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানসিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝেছি—দলীয় ছাত্ররাজনীতি ফিরে এলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জিত শান্তি ও স্থিতিশীলতা আবারও হুমকির মুখে পড়তে পারে। নানা প্রতিশ্রুতি বা সুবিধার প্রলোভন সামনে এলেও সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখন আর সেই পথে যেতে আগ্রহী নয়; বরং আমরা দৃঢ়ভাবে চাই, বিশ্ববিদ্যালয় থাকুক দলীয়মুক্ত, স্বতন্ত্র ও নিরাপদ।

আমাদের প্রত্যাশা, ক্যাম্পাসে বর্তমান শান্তিপূর্ণ পরিবেশ অটুট থাকুক; শিক্ষা, গবেষণা ও কাঠামোগত উন্নয়নের ধারা বাধাহীনভাবে চলুক; এবং কোনো রাজনৈতিক চাপ বা দখলদারিত্ব যেন আর কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে না পারে।

– মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন, শিক্ষার্থী, ৫১তম ব্যাচ, ইয়ার্ণ ইন্জিনিয়ারিং বিভাগ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসম্মত ক্যান্টিন ও খাবারের পরিবেশ চাই

বুটেক্সের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় চাই, যেখানে একাডেমিক উৎকর্ষের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও জীবনমানকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। সেই জায়গায় ক্যাম্পাস ক্যান্টিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—কারণ সারাদিনের ক্লাস, ল্যাব ও গবেষণায় ব্যস্ত শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের খাবারের প্রধান নির্ভরস্থল এটি।

গত বছর ক্যান্টিন সেবা তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য থাকলেও চলতি বছরে দায়িত্ব ও অবস্থান পরিবর্তনের পর খাবারের মান, স্বাস্থ্যবিধি ও স্যানিটেশন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এমনকি খাবারে পোকা পাওয়া এবং রান্নাঘরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে শিক্ষার্থীরা ক্যান্টিন বন্ধ করে প্রশাসনের কাছে তদন্ত ও মানোন্নয়নের দাবি জানায়—যা আমাদের স্বাস্থ্যনিরাপত্তার ন্যায্য প্রত্যাশাই প্রকাশ করে। আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু পাঠদান নয়; শিক্ষার্থীদের সুস্থ জীবনযাপন নিশ্চিত করাও এর অংশ। আর তার প্রথম ধাপ হলো পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, পুষ্টিকর এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার একটি ক্যান্টিন।

তাই আমাদের দাবি—

• নিয়মিত স্বাস্থ্যপরিদর্শন

• খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ

• দক্ষ তদারকি ব্যবস্থা

• প্রয়োজন হলে নতুন সেবা প্রদানকারী নিয়োগ

প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন নিশ্চিন্তে ও সুস্বাস্থ্যে পড়াশোনা করতে পারে—সেই জন্যই স্বাস্থ্যসম্মত ক্যান্টিন প্রয়োজন। প্রশাসন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌথ উদ্যোগে বুটেক্স খুব সহজেই তা নিশ্চিত করতে পারে।
সুস্থ দেহ, নিরাপদ খাদ্য—এটাই আমাদের দাবির সারমর্ম।

– সুব্রত কুমার পাল সৌভন, শিক্ষার্থী, ৫০তম ব্যাচ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ।

প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস চাই

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় দেশের একমাত্র বিশেষায়িত টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ভবিষ্যৎ টেক্সটাইল প্রকৌশলী ও গবেষক তৈরির এই প্রতিষ্ঠানে একটি সুশৃঙ্খল, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক ক্যাম্পাস পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি মানসম্মত ক্যাম্পাস কেবল শিক্ষার মান উন্নয়নে সহায়ক নয়, বরং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দৈনন্দিন কার্যক্রমকে আরও সহজ ও কার্যকর করে তোলে।
প্রথমত, ক্যাম্পাসের সার্বিক পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি অধিক গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। একটি পরিষ্কার ও সুন্দর ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি করে এবং ইতিবাচক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলে। শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরিতে পর্যাপ্ত উপকরণ এবং সাধারণ ব্যবহারের স্থানগুলো যেমন ওয়াশ রুম, ছাত্রী কমনরুম, নামাজের পাপোশ এগুলো অবশ্যই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার উচিত।
একইসঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও দ্রুততাও শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ক্ষেত্রে আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতি গ্রহণ করা হলে প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল ও ব্যবহারবান্ধব হয়ে উঠতে পারে। ডিজিটাল এন্ট্রি সিস্টেম, অনলাইন নথি ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া চালু হলে শিক্ষার্থীদের অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি কমবে এবং শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মীদের কাজের চাপও হ্রাস পাবে।
ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মতামত ও প্রতিক্রিয়া গ্রহণের প্রক্রিয়াও আরও কার্যকর হতে পারে। অনলাইন ফিডব্যাক সিস্টেম বা ডিজিটাল অভিযোগ ও পরামর্শ বাক্স শিক্ষার্থী ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগের একটি সুশৃঙ্খল ও প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে, যা ক্যাম্পাস উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমি মনে করি।

-রিজোয়ানা রহমান মীম, শিক্ষার্থী, ৪৯তম ব্যাচ, টেক্সটাইল ফ্যাশন এন্ড ডিজাইন বিভাগ।

আজকালের কন্ঠ/আর বি