গোপালগঞ্জ সোনাসুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে না চলে পাও, না চলে নাও | Daily AjKaler Kontho

গোপালগঞ্জ সোনাসুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে না চলে পাও, না চলে নাও


গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি: প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১০, ২০২৫, ১২:০০ অপরাহ্ন
গোপালগঞ্জ সোনাসুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে না চলে পাও, না চলে নাও

গোপালগঞ্জের একটি অবহেলিত বিদ্যালয়ের নাম সোনাসুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের চারিদিকে থৈ থৈ পানি। বর্ষায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুর্ভোগের যেন শেষ নেই। না চলে নাও, না চলে পাও। আওয়ামী লীগ সরকার একটানা ১৭ বছর ক্ষমতায় থাকলেও বিদ্যালয়টিতে যাতায়াতের দুর্ভোগ নিরশনে নেওয়া হয়নি কোন উদ্যোগ। এই নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে এলাকাবাসীর।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ২৪ নং সোনাসুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চারপাশে থৈ থৈ পানি। শতবর্ষী এই বিদ্যালয় ভবনটি যেন পানির মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃসঙ্গ প্রহরী। ১৯১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৮৭ জন, শিক্ষক রয়েছেন ৪ জন।

স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়, ‘না চলে নাও, না চলে পাও’। কথাটির বাস্তব রূপ দেখা গেল সরেজমিন এই বিদ্যালয়ে গিয়ে। স্কুলে যাওয়ার কোনো পাকা রাস্তা নেই। বর্ষার মৌসুমে হাঁটুসমান পানি ও কাদা মাড়িয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় চড়ে স্কুলে যেতে হয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। স্থলভাগ না থাকায় বিদ্যালয়ের মাঠও বছরের অধিকাংশ সময় থাকে পানির নিচে। ফলে ক্লাসরুমেই অনুষ্ঠিত হয় প্রতিদিনের সমাবেশ বা অ্যাসেম্বলি।

প্রতি বছর আষাঢ় থেকে কার্তিক পর্যন্ত পাঁচ মাস বিদ্যালয়টি জলাবদ্ধ থাকে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত বর্ষাকালে একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়দের। কোথাও হাঁটু সমান কাদা, কোথাও আবার বুক সমান পানি, এই পথ পেরিয়েই স্কুলে আসতে হয় শিশুদের। বর্ষাকালে নৌকা না থাকলে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। ফলে উপস্থিতির হার কমে যায়, শিক্ষার মানও ব্যাহত হয়।

এই কষ্টের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পানিবাহিত রোগের ভয়। স্কুলে যাওয়া–আসার পথে অনেকেই সর্দি-জ্বর, চর্মরোগে আক্রান্ত হয়। মাঝেমধ্যে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটে। একাধিকবার নৌকা ডুবির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এর ফলে অভিভাবকদের মধ্যে ভীতি কাজ করছে, যার প্রভাব পড়ছে ভর্তি শিক্ষার্থীর সংখ্যাতেও। অনেক পরিবার বর্ষাকালে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফেরদাউস মোল্লা জানায়, প্রতিদিন নৌকায় করে স্কুলে আসতে হয়। এতে অনেক কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে পানিতে পড়ে বই-খাতা ভিজে যায়, জ্বর হয়। আমাদের স্কুলে যাওয়ার জন্য একটা রাস্তা খুব দরকার।একই শ্রেণির শিক্ষার্থী বর্ষা খানম বলে, নৌকা না থাকলে স্কুলে যেতে দেরি হয়। যারা নৌকা বাইতে পারে না, তাদের আরও বেশি কষ্ট হয়। একটা রাস্তা করে দিলে আমরা সময় মতো স্কুলে যেতে পারবো, পড়াশোনাও ভালো হবে।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ মজিবুর রহমান বলেন, নৌকায় যাতায়াতের কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েই বিপাকে পড়েন। সময়মতো ক্লাস শুরু করা যায় না, পাঠদানে বিঘ্ন ঘটে। বর্ষাকালে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে যায়, আর এই কারণে ফলাফলেও প্রভাব পড়ে। শুধু তাই নয়, শিক্ষার্থী ভর্তির হারও দিন দিন কমছে। আমরা বহুবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে রাস্তা নির্মাণের দাবি জানিয়েছি। আশা করি দ্রুত এর সমাধান হবে।

বিদ্যালয়টির একাধিক অভিভাবক জানান, সন্তানদের প্রতিদিন নৌকায় পাঠাতে ভয়ে থাকতে হয়। সামান্য অসাবধানতাতেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসা সোনাসুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির উন্নয়নে আজও রয়েছে অবহেলায়। আওয়ামী লীগ সরকার একটানা ১৭ বছর ক্ষমতায় থাকলেও সোনাসুর প্রাইমারি স্কুলের যাতায়াতের কষ্ট দূর করতে এগিয়ে আসেনি কেই। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একটাই দাবি—বিদ্যালয়ের সঙ্গে একটি রাস্তা সংযোগ করা হোক, যাতে শতবর্ষী এই প্রতিষ্ঠানটি তার শিক্ষাযাত্রা আরও সুন্দরভাবে এগিয়ে নিতে পারে।

গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, জেলার ৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। সোনাসুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ওই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। ইতোমধ্যে বিদ্যালয়ের যাতায়াত–সংকট দূর করতে রাস্তা নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই কাজ শুরু করা হবে।

আজকালের কন্ঠ/আর এস/ডি