সরিষাবাড়ীবাসীর দুঃখের কারণ যখন দুই আন্তঃনগর ট্রেন | Daily AjKaler Kontho

সরিষাবাড়ীবাসীর দুঃখের কারণ যখন দুই আন্তঃনগর ট্রেন


আজকালের কণ্ঠ প্রকাশের সময় : মে ২৬, ২০২৫, ৬:৩৬ অপরাহ্ন
সরিষাবাড়ীবাসীর দুঃখের কারণ যখন দুই আন্তঃনগর ট্রেন

শফিকুল ইসলাম, সরিষাবাড়ী জামালপুর : যাত্রাপথে নিরাপদ বাহন হিসেবে মানুষ ট্রেনকেই বেছে নেয়। কিন্তু জামালপুর জেলাশহর এবং সরিষাবাড়ী উপজেলার সাধারণ মানুষের বড় দুঃখের কারণ হয়ে উঠেছে দুই আন্তঃনগর ট্রেন। ট্রেনদুটি হচ্ছে আন্তঃনগর জামালপুর এক্সপ্রেস এবং আন্তঃনগর অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস। বাজে টাইমিং, জায়গায় জায়গায় বিরতি, নিম্নধাচের লোকোমোটিভ ব্যবহারের কারণে জেলার এই দুই ট্রেনের যাত্রীদের দুর্ভোগ এখন নিত্যসঙ্গী। এই অঞ্চলে রেলওয়ের উর্ধ্বতন কোনো কর্তাব্যক্তি না থাকায়, দুর্ভোগের বিষয়টি অজানা রয়ে যায়। ফলে দুর্ভোগ নিয়েই যাত্রীরা নীরবে চলাচল করছে এই দুই বাহনে।

রেলওয়ে সূত্র হতে জানা যায়, কেবল জামালপুর জেলাতেই ঢাকা হতে পাঁচটি আন্তঃনগর এবং দুটি মেইল ট্রেন চলাচল করে। ট্রেনগুলোর মধ্যে গন্তব্যস্থল ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জবাজার, ঢাকা-তারাকান্দি এবং ঢাকা-ভূয়াপুর। সরেজমিনে দেখা যায়, নির্দিষ্ট টাইম শিডিউলে অন্যান্য ট্রেন সমূহ চললেও আন্তঃনগর জামালপুর এক্সপ্রেস এবং আগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেনের বেলায় চলে আসে বিপত্তি। ট্রেন দুটি ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন হতে সকাল সকাল ছাড়লেও সবচাইতে বেশি বিড়ম্বনা তৈরী হয় ঢাকায় পৌছাতে। ট্রেন দুটি ঢাকা হতে ছাড়ার পর দেড়-দুইঘন্টার মতো দেরীতে প্রায় নিয়মিত জামালপুরের স্টেশনগুলোতে পৌছাচ্ছে। আবার ফিরতি ঢাকার পথেও সময়ের বিড়ম্বনায় কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে পৌছায় ঠিক মাঝরাতে। এতে ফিরতি পথে ট্রেনদুটিতে সবসময়ই যাত্রীশূণ্যতা দেখা মিলছে। যারাও এই ট্রেন দুটিতে টিকিট কেটে যাত্রী হচ্ছে তারা মাঝরাতে রাজধানী শহরে প্রবেশ করছে। এতে একদিকে যেমন নিজেদের বাসাবাড়ীতে পৌছাতে দুর্ভোগ অন্যদিকে যাত্রীরা ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে বিভিন্ন দূর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।

যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই ট্রেনদুইটির শিডিউল পরিবর্তন এখন জরুরী হয়ে পড়েছে। এভাবে যাত্রীশূণ্য ট্রেন দুটি ঢাকার পথে নিয়মিত চললে জামালপুর অঞ্চলের যাত্রীদের তেমন কোনো সুবিধা তৈরী হবেনা। এতে রেলওয়ে কাঙ্খিত রাজস্ব হতেও বঞ্চিত হবে। যদি কার্যকর শিডিউল ব্যবস্থায় ট্রেন দুটিকে ফেরানো সম্ভব হয় তাহলে জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ এবং টাঙ্গাইলের তিন উপজেলার মানুষের রাজধানী ঢাকা কেন্দ্রিক যোগাযোগ আরও বেশি সহজ হবে। রেলওয়েও তার নির্দিষ্ট রাজস্ব হতেও বঞ্চিত হবেনা।

সরেজমিনে সরিষাবাড়ী রেলওয়ে স্টেশনে ঢাকাগামী যাত্রী হাবিবুল হাসান রিজভী জানান, জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী অঞ্চল সেই বৃটিশ আমল থেকেই রেলনেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত। ২০১২ সালে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট হতে যমুনাসেতু পূর্ব পর্যন্ত নতুন লিংক রোড এবং ২০২০সালে জামালপুর এক্সপ্রেস ট্রেন চালু ছাড়া রেলওয়ের এই অঞ্চলে দৃশ্যমান উন্নয়ন আর চোখে পড়েনি। বর্তমানে আন্তঃনগর দুইটি ট্রেনের নিয়মিত শিডিউল বিপর্যয় যাত্রীদের ট্রেন বিমুখ করে তুলেছে। এই অঞ্চলের ট্রেনদুটির যাত্রীবান্ধব পরিবেশ তৈরীতে প্রয়োজন এখন কার্যকর শিডিউল ব্যবস্থার। বিশেষ করে জামালপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটিকে পুরাতন রুটে(ঢাকা-টাঙ্গাইল-জামালপুর) ফিরিয়ে দেওয়া এবং এর শিডিউলটি পরিবর্তন করা জরুরী হয়ে পড়েছে। কিন্তু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবিষয়ে কোনো নজরই দিচ্ছেনা।

ঢাকাগামী আরেক যাত্রী মৌসুমী আক্তার জানান, ট্রেন নিরাপদ বাহন হলেও আমাদের অঞ্চলের যাত্রীদের জন্য বিশাল এক দুর্ভোগের কারণ। জামালপুর এক্সপ্রেস ও অগ্নীবিণা এক্সপ্রেস ঢাকার পথে আধঘণ্টা ব্যবধানে একই রুটে ফিরছে। কখন কোন ট্রেন ঢাকায় আগে যাবে তার শিডিউল নিয়েও তৈরী হয় বিড়ম্বনা। এতে চরম দুর্ভোগে যাত্রীরা। এছাড়া মধ্য রাতে ঢাকায় পৌছানোর পর ছিনতাইকারীসহ, গণপরিবহন সংকটের আরেক দুর্ভোগ তো আছেই। যাত্রীদের দুর্ভোগ বন্ধ করতে রেল কর্তৃপক্ষের উচিৎ হবে ট্রেনদুটিকে একটি সুন্দর শিডিউলে ফিরিয়ে আনা।

জামালপুর জংশন স্টেশন থেকে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ঢাকাগামী যাত্রী শিহাব হোসেন বলেন, ২০২৪ সালে জামালপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী হয়েছিলাম। ট্রেনটি রাত ২টায় ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে নামিয়ে দেয়। সেখান থেকে নিজের মেসবাসা তেজগাঁওতে যাওয়ার পথে মগবাজারে ছিনতাইকারীর শিকার হই। বড় ক্ষতি না হলেও সেসময় মোবাইল, নগদ অর্থ এবং হাতঘড়ি খোয়া যায় ছিনতাইকারীর হাতে। বিভিন্ন সময় পত্রিকাতেও দেখতে পাই এই ট্রেনের যাত্রীদের রাজধানীশহরে ছিনতাইয়ের কবলে পড়তে। যদি অন্য একটি সময় উপযোগী শিডিউলে ব্যবস্থা করা যায় তবে ট্রেনটির যাত্রীরা অনেক বেশি উপকার পাবে। বিষয়টি রেলওয়ের নজরে আনা এখন খুবই জরুরী।

জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলা হতে ২০১২সালে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে চালু হওয়া তারাকান্দি-ভূঁয়াপুর-যমুনা সেতু লিংক রেলপথ ছিল জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ এই ৫জেলার মানুষের স্বপ্ন। যমুনা সেতু পূর্ব থেকে ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের সরাসরি রেল যোগাযোগ উন্নয়নের জন্য রেলনেটওয়ার্কের সাথে দ্রুত যোগাযোগের পথ হিসেবে তৈরী হলেও বাস্তবিক অর্থে রেলকর্তাব্যক্তিদের নজরেই আসেনি।

জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার তারাকান্দি থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত ৩৩ কিলোমিটার লিংক রেলপথ। বর্তমানে টাঙ্গাইলের যমুনা সেতু পূর্ব রেলস্টেশন থেকে ভূঞাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। এতে করে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর, গোপালপুরসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের পাঁচ জেলার মানুষ। এ ছাড়াও পণ্য পরিবহনেও পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি।

বর্তমানে এই রেলপথে ভূঞাপুর পর্যন্ত কেবল দুটি লোকাল ট্রেনের চলাচল। ২০১২ সালে চালু হওয়ার পর থেকে আন্তঃনগর যমুনা এক্সপ্রেসসহ ৩টি লোকাল ট্রেন নবনির্মিত এ লাইনে চলাচল শুরু করে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে হঠাৎ এই লাইনে আন্তঃনগর যমুনা এক্সপ্রেস ট্রেনের চলাচল বন্ধ করে দেয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ময়মনসিংহ-ভূয়াপুর এই লাইনে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ফাইভ আপ (চট্টগ্রাম মেইল), রাত ৮টায় ময়মনসিংহ থেকে ছেড়ে আসা অন্য একটি লোকাল ট্রেনসহ মোট ২টি লোকাল ট্রেন চলাচল করছে। তবে ঢাকা-ভূঞাপুর পথে লম্বা রেলরাস্তা পারি দিতে সময়ের ক্ষেত্রে বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের।

এদিকে ময়মনসিংহ-জামালপুর-টাঙ্গাইল রেলপথে চলাচলকারী গরিবের ট্রেন নামে খ্যাত ধলেশ্বরী এক্সপ্রেস মেইল (৭৫-৭৬) একবছর যাবৎ বন্ধ।
ময়মনসিংহ থেকে ছেড়ে আসা জামালপুর-টাঙ্গাইলে চলাচলকারী ধলেশ্বরী এক্সপ্রেস মেইল ট্রেনটি ইঞ্জিন সংকটের অজুহাতে গত বছর ২০২৪ সালের ২৮ মে থেকে বন্ধ রয়েছে। ফলে ময়মনসিংহ হতে সরিষাবাড়ী-তারাকান্দি-ভুয়াপুর রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার যাত্রী।

ধলেশ্বরী এক্সপ্রেস ট্রেনটি ময়মনসিংহ থেকে দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে ময়মনসিংহের বিদ্যাগঞ্জ, পিয়ারপুর, জামালপুর জেলার নরুন্দি, নান্দিনা, জামালপুর টাউন রেলওয়ে স্টেশন, কেন্দুয়া বাজার, জাফরশাহী (ভাটারা), সরিষাবাড়ী, তারাকান্দি, জগন্নাথগঞ্জ পুরাতন ঘাট, শহীদনগর এবং টাঙ্গাইল জেলার হেমনগর, ভূঞাপুর ও ইব্রাহিমাবাদ (পূর্বের নাম যমুনা সেতু পূর্ব) রেলওয়ে স্টেশনে চলাচল করত। এসব রুটে চলাচলকারী যাত্রীদের ট্রেনের ভাড়ার থেকে ২/৩ গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে বাধ্য হয়ে অন্য যানবাহনে করে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। সব থেকে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ।

এদিকে জনবল সংকটের কারণে ইতোমধ্যে এই লিংকরুট রেলপথের ৪টি স্টেশনের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে দুটি রেলস্টেশন। রেলস্টেশনগুলো বন্ধ থাকায় যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। বর্তমানে বন্ধ থাকা এসব স্টেশনে চলে ধান মাড়াই, খড় শুকানো, জুয়া মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। স্টেশন বন্ধ থাকায় চুরি ও পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সরঞ্জাম। এসব রেলস্টেশন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকার ক্ষোভ জানিয়েছে স্থানীয়রা।

সার্বিক বিষয়ে সরিষাবাড়ী রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার আসাদুজ্জামান বলেন, প্রায় প্রতিদিনই ট্রেন বিলম্বে যাতায়াত করে। মাঝরাতে ও বিকেলে ঢাকার উদ্দেশে ছাড়লেও সকালে কোনো ট্রেন নেই। বর্তমানে ট্রেনগুলোর শিডিউল পরিবর্তন জরুরী হয়ে পড়েছে। একই সাথে বন্ধ স্টেশনগুলোতে লোকোবল বৃদ্ধির মাধ্যমে স্টেশনগুলো সচল রাখতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নজর রাখবেন।