লক্ষ্মীপুরে রাষ্ট্রীয় অর্থে গড়ে ওঠা টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও জনবল সংকটে কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছে না বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর—দুই জেলার দায়িত্ব পালন করছেন একজন সরকারি ব্যবস্থাপক (টেলিকম)। অন্যদিকে, উপজেলা পর্যায়ের কার্যালয়গুলোতেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন করে কর্মী। এতে গ্রাহকসেবা, টেলিফোন লাইনের ত্রুটি নিরসন ও নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভাষ্য, জনবল সংকটের কারণে দিন দিন গ্রাহক হারাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদনে বিটিসিএল কার্যালয়ের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, লক্ষ্মীপুরে কয়েক বছর আগে ল্যান্ডফোন গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৬৩২টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে গ্রাহক কমে যাওয়ার পেছনে জনবল সংকটের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, মোবাইল ফোনের ব্যাপক ব্যবহার এবং বিকল্প সেবার প্রতিযোগিতার প্রভাবও রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে গড়ে তোলা টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর যথাযথ ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত হচ্ছে কি না। একই সঙ্গে সেবার মান উন্নয়ন, বিদ্যমান গ্রাহক ধরে রাখা এবং নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ কতটা কার্যকর, তা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।
দুই জেলার দায়িত্ব এক কর্মকর্তার কাঁধে
বিটিসিএলের নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুরের দায়িত্বে থাকা সরকারি ব্যবস্থাপক (টেলিকম) মো. আলী শামীমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তাঁকে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর—দুই জেলার কার্যালয়ের দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে গ্রাহকদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, উপজেলা পর্যায়ের কার্যালয়গুলোতে একজন করে কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। জনবল সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটি দিন দিন গ্রাহক হারাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
একজন কর্মকর্তাকে দুই জেলার দায়িত্ব পালন করতে হওয়া এবং উপজেলা কার্যালয়ে সীমিত জনবল নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটির সেবাদানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে টেলিফোন লাইনের ত্রুটি মেরামত, গ্রাহকদের অভিযোগ নিষ্পত্তি, নেটওয়ার্ক সচল রাখা ও নতুন সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জনবল কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তবে লক্ষ্মীপুরে বিটিসিএলের অনুমোদিত পদের সংখ্যা, বর্তমানে শূন্য পদের পরিমাণ এবং জনবল সংকট নিরসনে কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া প্রয়োজন।
অবকাঠামো আছে, ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের চিত্র কতটা স্পষ্ট?
লক্ষ্মীপুরে বিটিসিএলের টেলিফোন নেটওয়ার্ক, কেবল, এক্সচেঞ্জ ও অপটিক্যাল ফাইবারসহ বিভিন্ন টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো রয়েছে। এসব অবকাঠামো ব্যবহার করে প্রচলিত টেলিফোন সেবার পাশাপাশি আধুনিক ইন্টারনেট, ডেটা ট্রান্সমিশন ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগসেবা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু জেলার কতটুকু নেটওয়ার্ক বর্তমানে সচল, কতটুকু অব্যবহৃত এবং কতটুকু সংস্কারের প্রয়োজন—এ বিষয়ে হালনাগাদ পরিসংখ্যান ছাড়া অবকাঠামোর প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
বিশেষ করে অব্যবহৃত কেবল, অপটিক্যাল ফাইবার, এক্সচেঞ্জ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির পরিমাণ, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং পুনরায় ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করা জরুরি। পাশাপাশি জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় অর্থে স্থাপিত অবকাঠামো দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকলে কিংবা যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কার্যক্ষমতা হারালে তা সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের প্রশ্ন তৈরি করে। তাই বিদ্যমান নেটওয়ার্কের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, সচল ও অচল সরঞ্জামের হিসাব এবং রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের তথ্য জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন।
গ্রাহক কমছে, কারণ অনুসন্ধান জরুরি
মোবাইল ফোনের ব্যাপক প্রসারের ফলে প্রচলিত ল্যান্ডফোনের ব্যবহার কমেছে—এটি টেলিযোগাযোগ খাতের একটি বাস্তব পরিবর্তন। তবে গ্রাহক কমে যাওয়ার পেছনে সেবার মান, ত্রুটি মেরামতে বিলম্ব, অভিযোগ নিষ্পত্তির সময় এবং বিকল্প ইন্টারনেট সেবার প্রতিযোগিতার মতো বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই লক্ষ্মীপুরে বিটিসিএলের গ্রাহকসংখ্যা কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কতজন নতুন গ্রাহক সংযোগ নিয়েছেন, কতজন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন, কী পরিমাণ অভিযোগ এসেছে এবং সেগুলো নিষ্পত্তিতে গড়ে কত সময় লেগেছে—এসব তথ্য পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে পারে।
একই সঙ্গে ল্যান্ডফোনের পাশাপাশি বিটিসিএলের আধুনিক ইন্টারনেট ও ডেটাভিত্তিক সেবার গ্রাহকসংখ্যা, আয় এবং সম্প্রসারণ কার্যক্রমের তথ্যও পর্যালোচনা করা জরুরি। এতে বোঝা যাবে, বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে কতটা এগোতে পারছে।
জবাবদিহি ও কার্যকর উদ্যোগের দাবি
লক্ষ্মীপুরে বিটিসিএলের জনবল সংকট নিরসন, সেবার মান উন্নয়ন এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি অনুমোদিত ও শূন্য পদের হিসাব, কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা, উপজেলা কার্যালয়গুলোর জনবল পরিস্থিতি এবং অবকাঠামোর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—লক্ষ্মীপুরে বিটিসিএলের কতটি পদ শূন্য রয়েছে? জনবল সংকট নিরসনে কী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে? বর্তমানে কতটি টেলিফোন সংযোগ সচল রয়েছে? অব্যবহৃত বা অকার্যকর অবকাঠামো পুনরায় কাজে লাগাতে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর এবং সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হলে জনবল সংকট ও গ্রাহক হারানোর প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে সেবার মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রেও তা সহায়ক হতে পারে।
রাষ্ট্রীয় অর্থে গড়ে ওঠা টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো জনগণের সম্পদ। এ সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। লক্ষ্মীপুরে জনবল সংকটের বাস্তব চিত্র নিরূপণ, অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকসেবা উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
আপনার মতামত লিখুন :