
পানিতে ভাসছে নৌকা। নৌকায় নৌকায় সাজানো টাটকা আমড়া। এক নৌকা থেকে আরেক নৌকায় চলছে দরদাম, কেনাবেচা ও পণ্য পরিবহনের ব্যস্ততা। ভাদ্রের শুরুতেই জমে উঠেছে ঝালকাঠির আমড়ার ভাসমান বাজার। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এই ব্যস্ততা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাইকার, আড়তদার ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে দক্ষিণাঞ্চলের এ জনপদ।
বরিশালের আমড়া নামে দেশজুড়ে পরিচিত এ ফলের বড় একটি অংশের জোগান আসে ঝালকাঠি জেলা থেকে। প্রতিবছর পেয়ারা মৌসুম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় আমড়ার মৌসুম। চলে প্রায় দুই মাস। এ সময়ে জেলার বিভিন্ন গ্রামে স্থল ও জলপথে বসে আমড়ার বাজার। তবে ঝালকাঠি সদর উপজেলার ভীমরুলি, শতদশকাঠি, ডুমুরিয়া, কাফুরকাঠি, হিমানন্দনকাঠী , আতা ও আশপাশের প্রায় ১০ গ্রামের ভাসমান বাজার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব বাজার থেকেই নৌ ও সড়কপথে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আমড়া সরবরাহ করা হয়।
মৌসুমের শুরুতে বর্তমানে প্রতি মণ আমড়া পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। স্থানীয় ফড়িয়া ও আড়তদাররা চাষিদের কাছ থেকে আমড়া কিনে তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এ বছর ফলন ভালো হওয়ায় দাম ও বেচাকেনা নিয়ে সন্তুষ্ট কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
আমড়া বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে। চাষি, শ্রমিক, ফড়িয়া, আড়তদার, নৌকার মাঝি ও পরিবহন শ্রমিক—বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শত শত মানুষ এ মৌসুমে আমড়াকে ঘিরে আয়-রোজগার করছেন। পাশাপাশি নৌকায় ভাসমান বাজারের দৃশ্য দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরাও ছুটে আসছেন ঝালকাঠিতে।
স্থানীয় আমড়া চাষিরা জানান, দক্ষিণাঞ্চলের আবহাওয়া ও জলবায়ু আমড়া চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এ কারণে ঝালকাঠির আমড়া আকারে তুলনামূলক বড় এবং স্বাদেও ভালো। তেমন পরিচর্যা, সার ও কীটনাশক ছাড়াই অনেক বাগানে আমড়ার ভালো ফলন হয়। বাজারে বিক্রির পাশাপাশি মৌসুমে সড়কের পাশ ও বিভিন্ন হাটবাজারেও প্রচুর আমড়া কেনাবেচা হয়।
আমড়া চাষি মো. নজরুল হাওলাদার, মো. ইকবাল চৌধুরী, অলোক হালদার, যতিন হালদার, সুমন মোল্লা, ভবেন রায়, পুলক হালদার, সঞ্জয় মিস্ত্রি, অঞ্জন হালদার, অমরেশ রায় ও বিপুল হালদার বলেন, ‘‘ঝালকাঠির মাটি ও আবহাওয়া আমড়া চাষের জন্য উপযোগী। ফলন ভালো হওয়ায় প্রতিবছরই আমড়ার বাগান বাড়ছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় এখন অল্প সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আমড়া পাঠানো যায়। এতে ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে এবং কৃষকরাও লাভবান হচ্ছেন।’’
চাষিরা আরও জানান, জাত ও গাছের আকারভেদে প্রতিটি আমড়াগাছের ফলন বিক্রি করে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। আমড়ার বড় সুবিধা হলো, অন্যান্য অনেক ফলের তুলনায় এটি দ্রুত পচে যায় না। ফলে দূর-দূরান্তের বাজারে পাঠানোর ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি সময় পাওয়া যায়।
ঝালকাঠি কৃষি বিভাগ বলছে, উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম এবং বাজারে চাহিদা থাকায় প্রতিবছরই জেলায় আমড়া চাষ বাড়ছে। একই সঙ্গে পদ্মা সেতুর কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত আমড়া সরবরাহের সুযোগ তৈরি হওয়ায় কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছর ঝালকাঠি জেলায় ৬০৫ হেক্টর জমিতে আমড়ার আবাদ হয়েছে। মৌসুম শেষে জেলায় প্রায় ৪ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন আমড়া উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, এ মৌসুমে ঝালকাঠির গ্রামগুলো থেকে প্রায় ২০/২৫ কোটি টাকার আমড়া বেচাকেনা হতে পারে।
ফলে আমড়ার মৌসুমকে ঘিরে এখন শুধু কৃষকের বাগান নয়, জমে উঠেছে পুরো গ্রামীণ অর্থনীতি। আর নৌকায় নৌকায় চলা এই ব্যতিক্রমী ভাসমান বাজার ঝালকাঠির কৃষিপণ্য বিপণনের পাশাপাশি পর্যটনেরও নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
আজকালের কন্ঠ/আর বি
আপনার মতামত লিখুন :