
একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু মাটির নিচে থাকা গ্যাস, কয়লা কিংবা তেলের মজুদের ওপর নির্ভর করে না; অনেক সময় তার ভবিষ্যৎ লুকিয়ে থাকে মানুষের মাথার ওপর প্রতিদিন এসে পড়া অবারিত সূর্যের আলোয়। বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও সীমিত জমির দেশে এই বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের নতুন শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা সৌরপার্ক স্থাপনের জন্য জমি সীমিত; কিন্তু শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত অসংখ্য বাড়ি, কারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও সরকারি ভবনের ছাদ প্রতিদিন বিনামূল্যে সূর্যের আলো গ্রহণ করছে।
জ্বালানি আমদানির ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্য ওঠানামার এই সময়ে তাই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কেবল পরিবেশবান্ধব বিকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়া নতুন প্রণোদনা ব্যবস্থায় ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে সিস্টেম স্থাপনকারীরা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত এই সুবিধা পাবেন। উৎপাদন ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা ৮ টাকা ধরে তার সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা ও ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যুক্ত করেই এই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এটি নিছক একটি আর্থিক প্রণোদনা নয়; বরং বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থার দর্শন পরিবর্তনের একটি সম্ভাব্য সূচনা। এত দিন সাধারণ মানুষ বিদ্যুতের গ্রাহক ছিলেন। এখন তিনি একই সঙ্গে বিদ্যুতের উৎপাদকও হতে পারেন। নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার এই ব্যবস্থাই ভবিষ্যতের ‘প্রসিউমার’ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারে।
বাংলাদেশে এই সম্ভাবনার ভিত্তি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ ইউটিলিটির নেটওয়ার্কে চার হাজার ৪৯০টির বেশি নেট-মিটার্ড রুফটপ সোলার সিস্টেম যুক্ত হয়েছে। এসব ব্যবস্থার সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ২১৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রযুক্তিটি আর কেবল পরীক্ষামূলক পর্যায়ে নেই; এখন প্রয়োজন দ্রুত সম্প্রসারণের।
সরকারের নতুন Renewable Energy Policy 2025-এও নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্যমতে, দেশের স্থাপিত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৭৮১ মেগাওয়াট। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আনতেই হবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো জমির সংকট। বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি প্রয়োজন হয়, যা কৃষিজমি ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে। অথচ একটি শিল্পকারখানার ছাদ, বহুতল ভবনের ছাদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন, হাসপাতাল কিংবা সরকারি দপ্তরের ছাদ ব্যবহার করলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন পড়ে না। বিদ্যমান অবকাঠামোকেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্পদে পরিণত করা যায়।
এ কারণেই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিকেন্দ্রীভূত চরিত্র। একটি বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবর্তে হাজার হাজার ক্ষুদ্র উৎপাদক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেন। এতে সঞ্চালন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থাও আরও স্থিতিস্থাপক হতে পারে।
বিশ্বের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। জার্মানি দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে সাধারণ নাগরিককে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের অংশীদারে পরিণত করেছে। অস্ট্রেলিয়া দেখিয়েছে, সাধারণ মানুষের বাড়ির ছাদও জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ভারত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে প্রায় গণআন্দোলনের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
ভারতের ‘PM Surya Ghar: Muft Bijli Yojana’-এর লক্ষ্য এক কোটি পরিবারকে রুফটপ সোলারের আওতায় আনা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় ২৩ লাখ ৯৬ হাজার পরিবার এই কর্মসূচির আওতায় এসেছে। শুধু প্রযুক্তি নয়, সহজ আবেদনপ্রক্রিয়া, আর্থিক সহায়তা, স্বল্পসুদে ঋণ এবং দক্ষ জনবল তৈরির মতো বিষয়গুলোও সেখানে সমান গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা রয়েছে। শুধু একটি প্রণোদনা ঘোষণা করলেই রুফটপ সোলার বিপ্লব ঘটবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি। বিদ্যুৎ বিভাগ, স্রেডা, বাংলাদেশ ব্যাংক, স্থানীয় সরকার, শিল্প মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
বিশেষ করে শিল্পখাতকে এই উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আনা জরুরি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপর আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের চাপ বাড়ছে। বৈশ্বিক ক্রেতারা এখন কার্বন নিঃসরণ, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং টেকসই উৎপাদনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে শিল্পকারখানার বিশাল ছাদ সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা গেলে একদিকে বিদ্যুৎ ব্যয় কমবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ‘গ্রিন কম্পিটিটিভনেস’ও বাড়বে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ব্যাটারিসহ একটি মানসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগ সাধারণ পরিবার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য এখনও বড় বাধা। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ‘গ্রিন লোন’ চালু করা প্রয়োজন। স্বল্পসুদে ঋণ, সহজ কিস্তি এবং বিশেষ অর্থায়ন ছাড়া মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় অংশ এই উদ্যোগের বাইরে থেকে যেতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মান নিয়ন্ত্রণ। নিম্নমানের সোলার প্যানেল, ইনভার্টার কিংবা ব্যাটারি বাজারে ছড়িয়ে পড়লে কয়েক বছরের মধ্যেই মানুষের আস্থা নষ্ট হতে পারে। তাই স্রেডা, বিএসটিআই এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নেট-মিটারিংয়ের আবেদন ও গ্রিড সংযোগের প্রক্রিয়া দ্রুত, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করা জরুরি।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে গ্রিড ব্যবস্থাপনা। হাজার হাজার ছাদ থেকে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে প্রচলিত বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে। স্মার্ট মিটার, রিয়েল-টাইম ডেটা, উন্নত পূর্বাভাস, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ এবং ডিজিটাল গ্রিড ব্যবস্থাপনার দিকে বাংলাদেশকে এগোতে হবে। অর্থাৎ আজকের রুফটপ সোলার প্রকল্পকে আগামী দিনের স্মার্ট জ্বালানি অবকাঠামোর ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সাম্প্রতিক ১০ টাকা ৫০ পয়সার প্রণোদনা তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু এই সুযোগকে কেবল সীমিত মেয়াদের প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে একটি জাতীয় রুফটপ সোলার মিশন হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রথম ধাপে প্রতিটি সরকারি ভবন, বিশ্ববিদ্যালয়, বিদ্যালয় ও হাসপাতালের ছাদকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার একটি বাধ্যতামূলক রোডম্যাপ তৈরি করা যেতে পারে। দ্বিতীয় ধাপে শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক ভবন এবং তৃতীয় ধাপে সামর্থ্যবান আবাসিক ভবনগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এর সঙ্গে সহজ গ্রিন ফাইন্যান্স, স্থানীয় যন্ত্রপাতি উৎপাদন, দক্ষ জনবল প্রশিক্ষণ এবং দ্রুত নেট-মিটারিং সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের জমি সীমিত, কিন্তু সূর্যের আলো সীমিত নয়। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা সীমিত, কিন্তু সূর্যের শক্তি আমদানি করতে হয় না। এই বাস্তবতাকে অর্থনৈতিক কৌশলে পরিণত করাই এখন সময়ের দাবি। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর সময়সীমা তাই শুধু একটি প্রশাসনিক তারিখ নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনার জানালা। সাহসী সিদ্ধান্ত, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে আজকের একটি সৌর প্যানেল আগামী দিনের জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি হতে পারে। এখন সময় ছাদকে শুধু ছাদ হিসেবে দেখার নয়। যে ছাদ এত দিন রোদ-বৃষ্টি থেকে আমাদের রক্ষা করেছে, সেই ছাদই আগামী দিনে ঘরের বাতি জ্বালাতে পারে, শিল্পের চাকা ঘোরাতে পারে এবং জাতীয় গ্রিডকে শক্তিশালী করতে পারে। প্রতিটি ছাদ হোক শক্তির ঠিকানা, প্রতিটি ঘর হোক জ্বালানি স্বনির্ভরতার অংশীদার। সূর্যের আলোতেই গড়ে উঠুক নিরাপদ, সবুজ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের নতুন জ্বালানি ভবিষ্যৎ।
লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
আজকালের কন্ঠ/আর বি
আপনার মতামত লিখুন :