তুহিন হত্যা মামলার দ্রুত বিচার দাবিতে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠ | Daily AjKaler Kontho

তুহিন হত্যা মামলার দ্রুত বিচার দাবিতে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠ


জামাল খান, ময়মনসিংহ ব্যুরো চীফ প্রকাশের সময় : অগাস্ট ৮, ২০২৬, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ন
তুহিন হত্যা মামলার দ্রুত বিচার দাবিতে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠ

একটি বছর পেরিয়ে গেছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় সময় বদলেছে, কিন্তু সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে হারানোর বেদনা আজও ততটাই তাজা। সহকর্মীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি বুকে ধারণ করে আবারও ন্যায়বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন সাংবাদিকরা। তাদের কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ, চোখে ছিল বেদনা, আর মুখে একটাই দাবি— “বিলম্ব নয়, তুহিন হত্যা মামলার দ্রুত বিচার চাই।”

শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকাল ১০টায় গাজীপুর মহানগরের ব্যস্ততম চান্দনা চৌরাস্তার ‘তুহিন চত্বর’-এ বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী ও সাংবাদিক নেতারা অংশ নেন। তারা তুহিন হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার আইনের আওতায় এনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির দাবি জানান।

মানববন্ধনের এক আবেগঘন মুহূর্তে উপস্থিত সবার দৃষ্টি কেড়ে নেয় নিহত সাংবাদিক তুহিনের ছয় বছর বয়সী ছেলে তৌকির। বাবার ছবিসংবলিত ব্যানারের সামনে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকা শিশুটির দৃশ্য উপস্থিত অনেককেই আবেগাপ্লুত করে তোলে। এক শিশুর নীরব উপস্থিতি যেন হাজারো কণ্ঠের চেয়েও জোরালোভাবে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—তার বাবার হত্যার বিচার কবে হবে?

কর্মসূচিতে প্রদর্শিত ব্যানারে বড় অক্ষরে লেখা ছিল, “৭ আগস্ট সাংবাদিক তুহিন হত্যার এক বছর, বিলম্ব নয়—দ্রুত বিচার আইনে বিচার করতে হবে।” ব্যানারের সেই আহ্বানই ছিল পুরো কর্মসূচির মূল প্রতিপাদ্য।

উল্লেখ্য, ঠিক এক বছর আগে গাজীপুরের ব্যস্ততম চান্দনা চৌরাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন। সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এক বছর পর একই স্থানে দাঁড়িয়ে সহকর্মীরা জানান, সময় পেরোলেও তাদের ন্যায়বিচারের দাবি একচুলও কমেনি।

বক্তারা বলেন, একজন সাংবাদিককে প্রকাশ্যে হত্যা করা শুধু একটি পরিবারের নয়, গোটা সাংবাদিক সমাজের ওপর আঘাত। এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকারের ওপরও সরাসরি আঘাত। তারা বলেন, সাংবাদিক হত্যা মামলার বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকলে অপরাধীরা উৎসাহিত হয় এবং আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়।

মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আহমেদ আবু জাফর, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. তাওহীদ হাসান, কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আলাউদ্দিন, ঢাকা জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আবুল কাশেম তালুকদার এবং সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা সিকান্দার আলী বাবুলসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সাংবাদিক নেতারা।

বক্তারা বলেন, তুহিন হত্যা মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়; এটি দেশের প্রতিটি সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্ন। অপরাধ প্রমাণিত হলে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে সাংবাদিক হত্যার বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে।

তারা আরও বলেন, “আজ আমরা শুধু তুহিনের জন্য দাঁড়াইনি। আমরা দাঁড়িয়েছি দেশের প্রতিটি সাংবাদিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অধিকারের জন্য। তুহিন হত্যা মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত হলে তা ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে।”

দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর সম্পাদক ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মো. খায়রুল আলম রফিক বলেন, “বাংলাদেশে বহু সাংবাদিক হত্যা মামলার বিচার আজও সম্পন্ন হয়নি। তবে তুহিন হত্যা মামলায় যেভাবে চার্জ গঠন শেষে দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে, তা সাংবাদিক সমাজের জন্য আশাব্যঞ্জক। বিচারিক কার্যক্রম একই গতিতে এগিয়ে গেলে এটি সাংবাদিক হত্যা মামলার বিচারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমরা বিশ্বাস করি, আইনের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হবে।”

বক্তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগের প্রতি মামলাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির আহ্বান জানান। তাদের ভাষায়, সাংবাদিক হত্যা কোনোভাবেই বিচারহীনতার তালিকায় যুক্ত হতে পারে না। ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলেই নিহত সাংবাদিকের পরিবার কিছুটা স্বস্তি পাবে এবং সাংবাদিক সমাজের মধ্যেও আইনের প্রতি আস্থা আরও দৃঢ় হবে।

এক বছর আগের সেই রক্তাক্ত স্মৃতিকে বুকে ধারণ করেই শুক্রবার আবারও সরব হয়ে ওঠে চান্দনা চৌরাস্তা। শোক, ক্ষোভ আর প্রত্যয়ের এক অনন্য মিলনে উচ্চারিত হয় একটাই দাবি— “তুহিন হত্যার বিচার চাই, বিলম্ব নয়—দ্রুত বিচার চাই।”

সাংবাদিক সমাজের প্রত্যাশা, এ দাবি আর কেবল মানববন্ধন, ব্যানার কিংবা স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে এবং সেই রায়ই হবে নিহত সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও দেশের সাংবাদিক সমাজের দীর্ঘ প্রতীক্ষার যথার্থ প্রতিফলন।

আজকালের কন্ঠ/আর বি