
বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সী’জ (বায়রা) এর সদস্যগণ প্রতি বছর ১০ লক্ষের অধিক বাংলাদেশী কর্মীর জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বছরে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার আয় করার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখছে যা ইতিমধ্যে একক অর্থবছর হিসেবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩০.৪ বিলিয়ন ডলার রেকর্ড অর্জন করেছে। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি রেমিটেন্স, আর রেমিটেন্স প্রবাহের হৃদপিণ্ড অভিবাসন সেক্টর।
বাংলাদেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাত জনশক্তি রপ্তানি খাত বর্তমানে স্মরণকালের সবচেয়ে মারাত্মক সংকটে নিপতিত। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে—এখনই ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে আগামী দিনে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এ খাতের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।
একদিকে অর্থনীতির “ব্লাড সঞ্চার” খ্যাত এই খাত ক্রমশ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে উত্তরণের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বৈধ অভিবাসনকে অসাধু এনজিও, বিদেশি স্বার্থান্বেষী লবিস্ট ও এক শ্রেণীর প্রশাসনিক ব্যক্তির বিভ্রান্তিমূলক প্রভাবের কারণে জটিলতার জালে আটকে ফেলা হয়েছে।
চলমান সংকটের প্রমাণসমূহ:
বৈধ অভিবাসনকে “মানব পাচার প্রতিরোধ আইন ২০১২”-এর সাথে কৌশলে সংযুক্ত করা
অভিবাসী আইন ২০১৩-এর বিভিন্ন ধারায় বৈধ অভিবাসনকে অপরাধের সাথে তুলনা করা
১৪ জুলাই ২০২৫-এর প্রজ্ঞাপনসহ একাধিক সংশোধনীতে রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যক্রমে নতুন বাধা আরোপ
অসাধু এনজিওদের মিথ্যাচার, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রিপোর্ট এবং এক শ্রেণীর আমলাতান্ত্রিক গোষ্ঠীর অপতৎপরতবর্তমান বাস্তবতা:
১. লাইসেন্স নবায়নে অযৌক্তিক জটিলতা
২. বহির্গমন ছাড়পত্র ইস্যুতে অপ্রয়োজনীয় বাধা
৩. অভিযোগ বাণিজ্যের নামে হয়রানি
৪. রিক্রুটিং এজেন্সির স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা
চলমান সৃষ্ট জটিলতা:
১.রিক্রুটিং লাইসেন্স নবায়নে অভিযোগ নিষ্পত্তি বা কর্মী প্রেরণের শর্ত বেঁধে দিয়ে লাইসেন্স নবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে।
২. দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত দেশের জনমানুষের দাবি “মানব পাচার প্রতিরোধ আইন ২০১২” এবং “অভিবাসী আইন ২০১৩-“এর কিছু ধারা/উপধারা কে বৈধ অভিবাসনের বিপরীতে দাঁড় করানো হয়েছে যা বৈধ অভিবাসন কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং অবৈধ অভিবাসন কে উৎসাহিত করছে।
৩. অভিবাসী আইন ২০১৩ এর বিতর্কিত বিধি সংযোজন করে সৌদি আরবগামী কর্মীদের বহির্গমন ছাড়পত্র প্রদানে জটিলতা তৈরি করা হয়, ফলশ্রুতিতে সৌদি আরবের ১ থেকে ২৪ পর্যন্ত (একক ভিসায়) বহির্গমন ছাড়পত্র বন্ধ থাকার ফলে হাজার হাজার কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষ পর্যায়ে, নিয়োগকর্তার সাথে সম্পর্ক নষ্ট, রিক্রুটিং এজেন্সি এবং কর্মী চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
৪. মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন জটিল নিয়মের কারণে একদিকে সকল রিক্রুটিং এজেন্সি সকল দেশে কর্মী পেরন করতে পারছে না, অন্যদিকে কর্মী প্রেরণ না করার কারণে ৪৫ টি রিক্রুটিং এজেন্ট এর লাইসেন্স বাতিল করা হয়।
৫. উদ্যোক্তা তৈরির জন্য নতুন রিক্রুটিং লাইসেন্স প্রদান চলমান প্রক্রিয়া, হঠাৎ করে মন্ত্রণালয় নতুন লাইসেন্স অনুমোদনের জন্য ২০ লক্ষ টাকা বাড়িয়ে ৫০ লক্ষ টাকা জমানতের বিধান তৈরি করেন। যার ফলে যারা নতুন লাইসেন্স অনুমোদন পেয়েছেন তাঁদের পক্ষে এত বিশাল জামানত প্রদান করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে দেশভিত্তিক জামানত প্রথা তৈরি করেছেন মন্ত্রণালয় যার কারনে বৃত্তশালীরা সকল সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে অন্যদিকে স্বল্প পুঁজির উদ্যোক্তারা হতাশ হয়ে পড়েছে।
৬.কর্মীর বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে অভিযোগ একটি চলমান প্রক্রিয়া সঠিক অভিযোগ নির্ণয় করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে দ্রুত কর্মী উপকৃত হয়, কিন্তু বিভিন্ন আইনের দোহাই দিয়ে এই অভিযোগ কে বাণিজ্যে পরিণত করেছে কিছু অসাধু এনজিও এবং কর্মকর্তারা। যার ফলে প্রকৃত সমস্যাগস্থ ব্যক্তি থেকে যাচ্ছে পর্দার আড়ালে অন্যদিকে সুবিধাভোগী ব্যক্তিগণ বিভিন্ন কৌশলে অনৈতিকভাবে অর্থ বাণিজ্য করছে যার ফলে কর্মী এবং রিক্রুটিং এজেন্ট উভয়েই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়া, সকল রিক্রুটিং এজেন্সিকে সৌদিসহ সংশ্লিষ্ট সকল দূতাবাসে তালিকাভুক্ত করা, মালয়েশিয়া,সিঙ্গাপুর, কুয়েত, জাপান সহ অন্যান্য সকল শ্রমবাজার সকল রিক্রুটিং এজেন্সির জন্যে উন্মুক্ত করা, লাইসেন্স জামানতের লভ্যাংশ পূর্বের নিয়মে বহাল রাখা,পে-অর্ডার জামানত ব্যবস্থা বাতিল করা,
কোনো দেশের জন্য সরকারি রিক্রুটিং এজেন্ট BOESL-কে একক এজেন্সি ব্যবস্থা না রেখে প্রয়োজনে G2G+ পদ্ধতি কার্যকর করা এবং নারীকর্মী প্রেরণ সহজীকরণ সহ রিক্রুটিং লাইসেন্স শ্রেণীবিন্যাস ABCD শ্রেণীকরণের ষড়যন্ত্র থেকে মন্ত্রণালয়কে বেরিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্ট তথা অভিবাসন সেক্টরের বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন চলমান সংকট গুলো একদিনে তৈরি হয়নি, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, অসাধু এনজিওদের নিরাপদ অভিবাসনের নামে ভিন্ন স্বার্থ বাস্তবায়ন সহ অধিদপ্তর জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এর অসাধু স্বার্থান্বেষী তথাকথিত কর্মকর্তাদের অনৈতিক আর্থিক লালসায় ধ্বংস করেছে এই সেক্টরের মেরুদন্ডকে। অতি দ্রুত সমস্যা চিহ্নিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে না পারলে এই দেশের আগামী দিনের অর্থনীতির জন্য একটি চরম হতাশার সময় অপেক্ষা করছে।
মোহাম্মদ মহিউদ্দিন
(অভিবাসন বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী)
আপনার মতামত লিখুন :