মোংলা প্রতিনিধি : জীবন্ত বাঘের দেশ সুন্দরবন। আর বাংলাদেশের বাঘের প্রথম কঙ্কাল তৈরি শুরু হয় সুন্দরবনে। যা গত বছর একটি পুরুষ বাঘের কঙ্কাল তৈরির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে।
আর গত সোমবার (১২ ফেব্রুয়ারি) শরণখোলা উপজেলার পূর্ব সুন্দরবনের আওতাধীন কচিখালী এলাকার একটি খাল থেকে উদ্ধার করা মৃত বাঘটি দিয়ে দ্বিতীয় কঙ্কাল তৈরির কাজ শুরু করেছে বন বিভাগ। বাঘের এ কঙ্কাল তৈরি করতে বন বিভাগের সময় লাগবে আড়াই মাস।
প্রথম কঙ্কালটি তৈরি হয়েছিল গত বছরের জানুয়ারী মাসে।আর তৈরিতে বনবিভাগের সময় লেগেছিল প্রায় এক বছর। বাঘের ওই কঙ্কালটি করমজল পর্যটন কেন্দ্রে রয়েছে। বনবিভাগের বলছে প্রথম কঙ্কাল তৈরিতে অভিজ্ঞতা কম ছিল তাই সময় লেগেছে। তবে দ্বিতীয় কঙ্কালটি দ্রুত তৈরি হবে।
কঙ্কাল তৈরিতে বাঘের মৃতদেহ থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় হাড়গুলো সংরক্ষণ করা হয়। হাড়ের রঙ যাতে পরিবর্তন না হয় এবং পোকামাকড় নষ্ট না করে সেজন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হয়। হাড়ের ভেতরে থাকা অস্থিমজ্জা বের করা হয় যাতে পোকার আক্রমণে রঙ নষ্ট না হয়। এভাবে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বাঘের অবয়ব তৈরি করা হয়।বাঘের প্রথম কঙ্কাল তৈরিতে সামনের দিক থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন করমজল পর্যটন ও বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজাদ কবির। বাঘের দ্বিতীয় কঙ্কালটিও তিনি করবেন।
বৃহস্পতিবার মুঠোফোনে এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় আজদ কবিরের । তিনি বলেন ‘সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালি অভয়ারণ্য এলাকার খাল থেকে উদ্ধার হওয়া মৃত বাঘটির চামড়া ও কঙ্কাল সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে। সেখানে বনবিভাগের সদস্যরা বিশেষ প্রক্রিয়ায় শরীর থেকে বাঘের চামড়া আলাদা করেছেন। এবং হাড় থেকে মাংস পৃথক করা হয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ মাংস ফেলে দিয়ে হাড়গুলোকে সিদ্ধ করা হবে। তারপর সেই হাড়কে পরিষ্কার করে, সব হাড়যুক্ত করে বাঘের অবয়ব তৈরি করা হবে। সব কাজ শেষ হলে বাঘটির চামড়া ও কঙ্কাল সংরক্ষণ করা হবে করমজল ইন্টারপ্রিটেশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সেন্টারে। সংরক্ষণ প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রায় আড়াই মাস সময় লাগবে।আর এটিই হবে বাংলাদেশের বাঘের দ্বিতীয় কঙ্কাল দাবী আজাদ কবিরের।
বাংলাদেশের প্রথম বাঘের কঙ্কাল সুন্দরবনের পর্যটন কেন্দ্র করমজল ইন্টারপিটিশন ও ইনফরমেশন সেন্টারে ।
প্রথম বাঘের কঙ্কাল তৈরি অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে আজাদ কবির বলেন ‘ ২০২২সালে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার চর এলাকায় বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যাওয়া একটি পুরুষ বাঘের হাড় ও অন্যান্য অঙ্গ থেকে প্রথম বাঘের অবয়ব তৈরি করা হয়েছে। ২০২২ সালের ২৯ জানুয়ারি কোনো বিশেষজ্ঞ টিম ছাড়াই বাঘের কঙ্কাল তৈরির কাজ শুরু করা হয়। ঠিক একবছর পর ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি সফলভাবে সেই কঙ্কাল তৈরির কাজ শেষ হয়।তিনি বলেন ‘মৃত কুমিরের হাড় দিয়ে কঙ্কাল তৈরি করার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রথম বাঘের কঙ্কাল তৈরি করা হয়েছিল। এ কাজে সহায়তা করেছে বন বিভাগের বোটম্যান মোস্তাক আহমেদ, কুমির শেডের তত্ত্বাবধায়ক নিমাই রপদান ও করমজল পর্যটন ও বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ আবুল হাসান ।
বন বিভাগের তথ্য মতে, ২০০১ সাল থেকে ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৩ বছরে সুন্দরবনে নানাভাবে ৪১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে ২৫টি এবং পশ্চিম বিভাগে ১৬টি বাঘের মৃত্যু হয়। কখনো চোরা শিকারির হাতে কখনোবা লোকালয়ে গিয়ে গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা গেছে বাঘ। আর ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে, অসুস্থ হয়ে এবং বার্ধক্যের কারণে বাঘ মারা যাচ্ছে সুন্দরবনে। এই সময়ের মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ২০টি বাঘের চামড়া।
২০১৮ সালের জরিপ অনুসারে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা ১১৪টি। তবে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়ায় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বন বিভাগ আশা করছে। বর্তমানে বনে ক্যামেরা ট্রাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ গণনার কাজ চলছে।
খুলনা বিভাগীয় বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো বলেন, “ গত সোমবার (১২ ফেব্রুয়ারি) উদ্ধার করা বাঘটির দেহাবশেষ বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হবে। সুন্দরবনের করমজল কেন্দ্রে ইন্টারপ্রিটেশন ও ইনফরমেশন সেন্টার আছে। সেখানে এটি স্টাফিং করে রাখা হবে।