কোভিড-১৯ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম এবং ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মারা যাওয়ার পর মন্ত্রী-এমপিদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে সংসদ সচিবালয়। চলমান বাজেট অধিবেশনে যোগদান করা বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এবং গণফোরামের এমপি মোকাব্বির খানের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ফলাফল পজিটিভ আসায় এই উদ্বেগ তৈরি হয় মৃতুশঙ্কায়। যেকারণে জাতীয় সংসদ ভবনকে সুরক্ষিত রাখা এবং প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনাসহ অধিবেশনে যোগ দিতে যাওয়া সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মন্ত্রী-এমপিদের সংসদে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার রহিত করে দেয়া হয়েছে। একইসাথে আগামী চারটি বৈঠকে অংশগ্রহণ করার কথা রয়েছে এমন ১৭০ জন এমপির করোনা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে।
সংসদ সচিবালয় জানায়, এরইমধ্যে মন্ত্রী-এমপিদের করোনা শুরু হয়েছে। শনিবার ২০ জন এবং রোববার ৪৫ জনের নমুনা নিয়েছে সংসদ মেডিক্যাল সেন্টার। বাকিদের পরীক্ষাও আজ এবং কালের মধ্যে শেষ করা হবে বলে জানা গেছে। তবে মন্ত্রী-এমপিদের পরীক্ষায় আক্রান্তের সংখ্যা খুব বাড়বে বলে মনে করেন না সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী।
তিনি জানান, শনিবারের পরীক্ষার ফলাফলে ২০ জনের কারোরই পজিটিভ আসেনি। সবাই সুস্থ আছেন। তবুও বাজেট অধিবেশনের বাকি কার্যদিবসগুলোতে যেসব এমপি অংশ নেবেন, তাদের কোভিড-১৯ পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
তিনি নিজেও শনিবার নমুনা দিয়েছেন জানিয়ে চিফ হুইপ বলেন, আমরা এমপিদের আহ্বান করেছি করোনা পরীক্ষা করার জন্য। তারা সাড়া দিচ্ছেন। বাজেট অধিবেশনের বাকি দিনগুলোতে যারা অংশ নেবেন, তাদের এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অধিবেশন আরো সীমিত হবে কিনা এ প্রশ্নে চিফ হুইপ বলেন, পরিস্থিতির ওপর সব নির্ভর করছে। তবে আমরা অধিবেশনের যোগদানকারী সবাইকেই টেস্টের আওতায় আনছি।
করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের মধ্যেই গত ১০ জুন বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে। ১১ জুন আগামী অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অন্যান্য বছর বাজেটের ওপর আলোচনা মাসব্যাপী হলেও এবার করোনার কারণে প্রথমে আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট করা হয় ১২-১৫ দিন। কিন্তু প্রথম দিনই সংসদের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়। এরমধ্যে সম্পূরক বাজেট পাসের দিন থেকে এ পর্যন্ত আরও ১৫ এমপি এবং সংসদের ৯৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর করোনা শনাক্তের ঘটনায় আতঙ্ক দেখা দেয়। তাই এবার বাজেট অধিবেশন ৮-৯ কার্যদিবসে সীমাবদ্ধ হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বাজেটের উপর আলোচনার দিন ও ঘণ্টা কমছে। পরিবর্তিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সাধারণ বাজেটের উপর আলোচনা হবে তিন দিন ২৩, ২৪ ও ২৯ জুন। ৩০ জুন বাজেট পাসের পর জুলাই মাসে হয়তো একদিন সংসদের বৈঠক করে অধিবেশনের সমাপ্তি টানা হতে পারে।
সংসদ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অধিবেশন শুরুর আগে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য নির্ধারিত এমপিদের করোনাভাইরাস পরীক্ষার বিষয়টি আলোচনা হয়। তবে তখন তা আর এগোয়নি। শুধু সংসদে কর্মরতদেরই পরীক্ষা করা শুরু হয়। এতে ব্যাপক সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর করোনা পজিটিভ ফলাফল আসে, যাদের অধিকাংশই উপসর্গহীন। এই সময়ে বেশ কয়েকজন এমপি ও মন্ত্রীর করোনা পজিটিভ ফলাফল চলে আসে।
সূত্রমতে, এ পর্যন্ত ১৫ জন এমপির করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়েছে। তাদের মধ্যে নওগাঁর শহীদুজ্জামান সরকার সুস্থ হয়ে উঠেছেন। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ সম্প্রতি মারা গেছেন।
এছাড়া আক্রান্তদের মধ্যে আছেন- মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুনশি, সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর ঊশৈসিং, ফরিদপুর-৩ আসনের এমপি খন্দকার মোশাররফ হোসেন, চট্টগ্রামের বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আসনের মোছলেম উদ্দিন আহমদ, যশোরের অভয়নগর-বাঘারপাড়া আসনের রণজিৎ কুমার রায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এবাদুল করিম বুলবুল, জামালপুরের ফরিদুল হক খান, চট্টগ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী, নড়াইলের মাশরাফি বিন মর্তুজা এবং গণফোরাম নেতা মোকাব্বির খান। এছাড়া সংসদ সচিবালয়ের প্রায় শতাধিক১০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।
সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এবং গণফোরামের মোকাব্বির খান আক্রান্ত হওয়ার ফলাফল আসার আগে সংসদে গিয়েছিলেন। এরপরই সংসদ সদস্যদের করোনাভাইরাস পরীক্ষা করার বিষয়টি আলোচনায় আসে। ওই কর্মকর্তা জানান, যারা সংসদের বৈঠকে অংশ নেবেন তাদের পরীক্ষা হয়ে গেলে বাকিদেরও পরীক্ষা করানো হতে পারে।