Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ , ১:১৭ অপরাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ ডিসেম্বর ১৫, ২০২২ , ৮:২৭ অপরাহ্ণ

দায়মুক্তি ও ভয়ভীতি: উগ্রতার মুখে ন্যায়বিচার যখন অন্ধ

লেখকঃ মোঃ লুৎফর রহমান

বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় নারীর অংশগ্রহণ আজ আর কোনো ব্যতিক্রম বিষয় নয় বরং এটি অর্থনীতি ও সমাজের এক অপরিহার্য বাস্তবতা। শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা উদ্যোগে নারীর উপস্থিতি ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু এই অগ্রগতির সমান্তরালে একটি অস্বস্তিকর ও গভীর উদ্বেগজনক প্রবণতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে: উগ্র মানসিকতা ও সংকীর্ণ ধর্মীয় ব্যাখ্যার আশ্রয়ে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী এখনো নারীর এই অংশগ্রহণকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। গাজীপুরের একটি সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এই সংকটের এক বীভৎস রূপ আমাদের সামনে উন্মোচিত করেছে, যেখানে একজন নারী উদ্যোক্তার তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নকে উগ্রবাদের দোহাই দিয়ে ধূলিসাৎ করার চেষ্টা চালানো হয়েছে।

এই প্রশ্নবিদ্ধকরণ কেবল মতাদর্শের স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক ক্ষেত্রেই তা রূপ নেয় ভয়ভীতি, সামাজিক অপবাদ এবং সরাসরি শারীরিক সহিংসতার মধ্যে। অভিযোগ রয়েছে, নারী-নেতৃত্বাধীন বৈধ ব্যবসাকে ‘অসামাজিক কার্যক্রমের আখড়া’ আখ্যা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত প্রয়াসে লিপ্ত থাকে কিছু গোষ্ঠী, যেখানে তথ্যপ্রমাণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার। গাজীপুরের একটি বিউটি পার্লারে সংঘটিত এক ঘটনায় স্থানীয় এক ধর্মীয় নেতার নেতৃত্বে বর্বরোচিত হামলা এবং চামড়ার বেল্ট দিয়ে একজন নারীকে আঘাত করার চেষ্টা, সভ্য সমাজের জন্য এক চরম অপমান। যখন একজন শিক্ষিত নারী নিজের মেধা ও পরিশ্রমে সফল হতে শুরু করেন এবং অন্য নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার প্রশিক্ষণ দেন, তখন তাঁকে বিপথগামী হিসেবে চিহ্নিত করার পেছনে মূলত কাজ করে আধিপত্যবাদী পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার প্রবণতা।

এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি। যখন এমন হামলা কিংবা সহিংস ঘটনার পরও দৃশ্যমান ও কার্যকর আইনগত প্রতিকার অনুপস্থিত থাকে, তখন সেটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয় বরং একটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। একাধিকবার প্রশাসনের কাছে অভিযোগ ও সাধারণ ডায়েরি করা সত্ত্বেও যখন প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতাদের নাম এজাহার থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তখন প্রশ্ন জাগে, আইনের শাসন আদৌ কি সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর? এই দায়মুক্তিই আসলে অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে, আর ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা হারাতে থাকেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন অভিযোগ ওঠে যে ভুক্তভোগীরা প্রত্যাশিত সহায়তা পাচ্ছেন না কিংবা তাঁদের অভিযোগকে প্রভাবের কারণে গুরুত্বসহকারে নেওয়া হচ্ছে না, তখন ন্যায়বিচার কার্যত অন্ধ হয়ে পড়ে। ন্যায়বিচার যদি বিলম্বিত হয় কিংবা প্রভাবশালী চাপে বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে তা মূলত নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করারই শামিল। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কিছু গোষ্ঠী নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অশনি সংকেত।

এই প্রেক্ষাপটে বিষয়টি কেবল নারী উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির প্রশ্ন। যখন একজন নারী নিজের মেধা ও পরিশ্রমে এগিয়ে যেতে চান, তখন তাঁর সামনে যদি সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা না থাকে, তবে তা পুরো সমাজের জন্যই একটি নেতিবাচক সংকেত বহন করে। এটি অন্য নারীদের জন্যও এক নীরব সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়ায় যে, উগ্রবাদের গণ্ডি অতিক্রম করতে গেলে একটি মূল্য চুকাতে হয়। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় নীতিতেও নারী ক্ষমতায়নকে উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

নারী সমাজকে সর্বদা দুটি বিপরীত মেরুতে বিভক্ত করে দেখার যে ‘বাইনারি ফ্রেমিং’ উগ্রবাদীরা ব্যবহার করে, তার মূল লক্ষ্য হলো নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা রুদ্ধ করা। হেফাজতে ইসলামের মতো গোষ্ঠীগুলোর ১৩ দফা দাবিনামায় নারীর চলাফেরা এবং কাজের সুযোগ সীমিত করার যে আহ্বান দেখা গিয়েছিল, তার প্রতিধ্বনি আজও বিভিন্ন ঘটনায় লক্ষ করা যায়।

প্রশ্নটা তাই আর এড়িয়ে যাওয়ার নয়; আমরা কি এমন একটি সমাজের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে প্রগতি ভয়ভীতির কাছে থেমে যাবে? নাকি এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই, যেখানে আইনের শাসন সত্যিকার অর্থেই সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে? উগ্রতা তখনই শক্তি পায়, যখন তা প্রতিরোধের মুখোমুখি হয় না; আর দায়মুক্তি তখনই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, যখন ন্যায়বিচার দৃশ্যমান থাকে না।

পরিশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন নারীর পথ রুদ্ধ হওয়া মানে কেবল একটি সম্ভাবনার মৃত্যু নয়; এটি একটি সমাজের ভবিষ্যৎকেই সংকুচিত করে ফেলা। এই বাস্তবতায় প্রয়োজন কেবল নীতিগত বক্তব্য নয়, বরং কার্যকর পদক্ষেপ, যেখানে আইন প্রয়োগ হবে নিরপেক্ষভাবে, ভয়ভীতির রাজনীতি ভেঙে পড়বে, এবং প্রতিটি নাগরিক, বিশেষ করে উদ্যোক্তা নারীরা, পূর্ণ নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারবেন। প্রগতিশীলতাকে দণ্ড দিয়ে শাসন করার দিন শেষ হোক; ক্ষমতার চেয়ে জীবনের মূল্য এবং অন্ধকারের চেয়ে আলোর শক্তি জয়ী হোক।

প্রিন্ট করুন