Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ , ১০:০৬ অপরাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ অক্টোবর ২৩, ২০২২ , ৭:২৩ অপরাহ্ণ

পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্টে আছেন নড়াইলের লোহাগড়ার কালনা ঘাটের মাঝীরা

লেখকঃ আজকালের কণ্ঠ

লোহাগড়া (নড়াইল) প্রতিনিধিঃ বাপ দাদার পেশা ধরে রাখার জন্য প্রায় ৫০ বছর ধরে জীবিকা নির্বাহ করলেও এখন পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে কালনা ফেরিঘাটের মাঝিরা। প্রতিদিন হাজারো যাত্রী পারাপার করলেও এখন কোন যাত্রী পাচ্ছেন না তারা!

মাঝীরা বলেন গত ১০ই অক্টোবর মধুমতী সেতু চালু হওয়ার পর থেকে ফেরিঘাটে পারাপারের জন্য কোন যাত্রী আসে না! সেতু চালু হওয়ার আগে প্রতিদিন ৭০০/৮০০ টাকা কামাই হতো এতে পরিবার পরিজন নিয়ে ভালই ছিলাম ! সেতু চালু হওয়ার পর কামাই পুরোপুরি বন্ধ। কেউ তাদের খোজও নিচ্ছে না। তারা বলছেন একদিকে ঋণ পরিশোধের চাপ অন্যদিকে সংসারের বোঝা। যারজন্য চরম দুশ্চিন্তা ও হতাশার মধ্যে দিন পার করছেন কালনা ফেরিঘাটের ৪৮টি মাঝি পরিবার।

এ বিষয়ে মাঝীদের সাথে গত শুক্রবার কথা বলতে গেলে চরকালনা গ্রামের মোঃ তবিবর মোল্যা(৬৪) বলেন প্রায় ৫০ বছর ধরে লোহাগড়া মধুমতী নদীর কালনা ঘাটে নৌকা পারাপার করে আসছিলেন। বাপ দাদার পেশাও ছিল এটি। সম্প্রতি মধুমতী সেতু চালু হওয়ার পর থেকে তবিবর মোল্যা সহ আরও অনেকেই বেকার হয়ে পড়েছে। এখন সংসার কীভাবে চালাবেন তা নিয়ে আছে চরম হতাশা ও দুশ্চিন্তায়। এই শেষ বয়সে এসে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে এ কথা বলতে বলতে মোঃ তবিবর মোল্যা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

একই গ্রামের মোঃ রমজান কাজী(৪৫) বলেন শিশুকাল থেকে আজ প্রায় ৩২ বছর ধরে মধুমতী নদীর কালনা ঘাটে নৌকা পারাপার করে আসছিলেন। মধুমতী সেতু চালু হওয়ার পর থেকে পারাপারের জন্য সারাদিনে চারজন যাত্রীও পায় না। কিছুদিন আগে ইঞ্জিন চালিত নৌকাটি মেরামতের জন্য বেশ কিছু টাকা ঋণ করেছিলেন। একদিকে ঋণ পরিশোধের চাপ অন্যদিকে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ ও সংসারের বোঝা। বুকে পাথর নিয়ে কান্না সুরে বলেন ভবিষ্যতে কি করবেন তারও নিশ্চয়তা খুজে পাচ্ছেন না।

একই অবস্থা, মোঃ মিন্টু মোল্যা(৩৬) মোঃ মন্নু মোল্যা(৪০) মোঃ রেজাউল কাজী(৩৯) মোঃ রবিউল মোল্যা(৩৭) মোঃ মারুফ মোল্যা(৪৪) সহ অন্যদের।

নৌকায় শুধু ঘাট পারাপারের কাজেই নয়, নদীতে বিনোদনের জন্য বা বনভোজন করতে অনেকে ভাড়া নিতেন। প্রশাসনও কাজে লাগাত এসব নৌকা। সেতু হওয়ায় এখন এ পেশা ছাড়তে হচ্ছে তাঁদের।

বাদশা মিয়া ও তবিবর রহমানসহ বেশ কয়েকজন জানালেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মুর্তজা গত সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পেয়ে প্রথম যেদিন এ ঘাট দিয়ে নড়াইল এসেছিলেন, সেদিন লাখো জনতা ঘাটে অপেক্ষা করছিল। মাশরাফি ও তাঁর সঙ্গীদের তাঁরা নৌকায় করে পার করে দিয়েছিলেন। এখন তাঁর কাছে ও সরকারের কাছে দাবি, মধুমতী সেতুর নিচে অনেক জায়গা, এখানে একটি সুন্দর পার্ক (বিনোদন কেন্দ্র) স্থাপন করা হোক। তাহলে ঘাটের নৌকার শ্রমিক ও ক্ষুদ্র দোকানিরা বেঁচে থাকতে পারবেন।

ছয় লেনের দৃষ্টিনন্দন মধুমতী সেতু চালুর পর থেকে লোকজন সেখানে আসছেন। ভবিষ্যতেও মানুষ সেতুটি দেখতে আসবেন। সেখানে পার্ক থাকলে এলাকার গরিব মানুষের নানাভাবে কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁরা আরও জানান, সেতুর পাশে ফেরিঘাটকে কেন্দ্র করে খাবার হোটেল, মুদিদোকান ও চায়ের দোকানসহ ৫২টি ক্ষুদ্র দোকান গড়ে উঠেছিল। এখন অধিকাংশ দোকানই বন্ধ হয়ে গেছে।

যুবক হাবিল মোল্লা চা, পান ও বিস্কুট বিক্রি করতেন। এর ওপরই চলত তাঁর সংসার। খাবার হোটেল চালাতেন বাবলু শেখ (৪২)। তাঁর হোটেলও সেতু উদ্বোধনের পর থেকে বন্ধ আছে। বাবলু শেখ বলেন, সেতুর নিচে ও পাশে বিনোদন কেন্দ্র স্থাপনের ভালো পরিবেশ আছে। সরকারি বা বেসরকারিভাবে বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠলে তাঁদের মতো বেকার হয়ে পড়া মানুষের একটা উপায় হতো। এলাকার মানুষও বিনোদন সুবিধা পেত।
নৌকা শ্রমিকেরা জানালেন, মধুমতী সেতু উদ্বোধনের পর রাতে মাশরাফি বিন মুর্তজা সেতু দিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন। তখন নৌকা শ্রমিকেরা সেতুতে তাঁকে আটকিয়ে তাঁর কাছে কর্মসংস্থান ও বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানান। মাশরাফি বিষয়টি নিয়ে কাজ করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

এছাড়া কিছুদিন আগে সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুজা সাংবাদিকদের বলেন ঘাট-সংলগ্ন কালনায় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ওঠার প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন। সেটি হলে ঘাট এলাকার মানুষের নানাভাবে কর্মসংস্থান তৈরি হবে। ধীরে ধীরে বিনোদন কেন্দ্রও গড়ে উঠবে।

আজকালের কন্ঠ /রাকিব /কাজী ইমরান

প্রিন্ট করুন