নিজস্ব প্রতিবেদক : আওয়ামী লীগে এখন উৎসব চলছে। দলটির তৃণমূল থেকে কেন্দ্র সর্বত্র কাউন্সিল উত্তেজনা। বাদ পড়ছে না সহযোগী সংগঠনগুলো। আগামী নভেম্বরে দলটির চারটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় সম্মেলন। এবারের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্ব পেতে যাচ্ছে সংগঠনগুলো। শীর্ষ পদে থাকা বর্তমান নেতারা প্রায় সবাই বাদ পড়তে পারেন বলে জোর গুঞ্জন রয়েছে।
শীর্ষপদ ছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদেও বিতর্কিতরা বাদ পড়তে পারেন। অধিকতর ক্লিন ইমেজ, শিক্ষিত, মেধাবী ও সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এমন নেতাদের শীর্ষ পদে আনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। গত এক দশকে সহযোগী সংগঠনের মধ্য যেসব বাজে প্রকৃতির লোক ও অনুপ্রবেশকারী কমিটিতে স্থান পেয়েছেন তাদেরও বাদ দেয়া হবে।
দুর্নীতিমুক্ত ও ক্লিন ইমেজের নেতাদের এবার কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান দেয়া হবে। জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের এক প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, কতিপয় নেতার কারণে সংগঠনগুলো দুর্বৃত্তদের কবলে পড়েছে। নেত্রী শুদ্ধি অভিযান এবং সম্মেলনের মাধ্যমে সেখান থেকে বের করে সংগঠনগুলোতে যোগ্য, মেধাবী নেতৃত্ব আনতে চান এবং সেটাই হবে।
আগামী ৬ নভেম্বর কৃষক লীগ, ৯ নভেম্বর জাতীয় শ্রমিক লীগ, ১৬ নভেম্বর স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ২৩ নভেম্বর যুবলীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হবে। কেন্দ্রীয় শীর্ষ পদের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণের শীর্ষ পদেও এবার নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। চলমান দুর্নীতি ও ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও কৃষক লীগ নেতাদের সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
সংগঠন চারটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অবৈধ পন্থায় বিত্তশালী হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অর্থের বিনিময়ে জামায়াত-বিএনপি থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীদের সহযোগী সংগঠনগুলোতে স্থান দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ সংক্রান্ত অভিযোগের তালিকা ও গোয়েন্দা রিপোর্ট রয়েছে। যার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে ইতোমধ্যে তিনি দলের মধ্যে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন।
এর অংশ হিসেবে যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটসহ বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন করে এসব সংগঠনের শীর্ষ পদে ক্লিন ইমেজ সম্পন্ন বিতর্কহীন নেতাদের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে চান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
২০১২ সালে ওই চার সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বে অর্থাৎ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে আসা নেতারা এর আগেই সংগঠনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। ফলে অন্তত এক যুগ ধরে সংগঠনগুলোর দায়িত্বে রয়েছেন তারা। আগামী সম্মেলনের মাধ্যমে তাদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত তরুণ, মেধাবী ও ত্যাগী নেতাদের দায়িত্বে আনা হবে। দলীয় সভানেত্রীর এমন বার্তা পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে দলের মধ্যে কোণঠাসা হয়ে পড়া দলের ত্যাগী নিবেদিতপ্রাণ ও সাধারণ নেতাকর্মীসহ জণগণের মাঝে ক্লিন ইমেজ রয়েছে এমন নেতারা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে সাবেক ছাত্রনেতারা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের দায়িত্বে আসতে তৎপরতা শুরু করেছেন।
আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের পাশাপাশি গণভবনে গিয়ে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার দৃষ্টি আর্কষণ করার চেষ্টা করছেন। এছাড়া বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ও ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়েও পদপ্রত্যাশীদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে ।
জানা গেছে, আগামী ৬ নভেম্বর কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় ৭ বছর পর এবার কৃষক লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সর্বশেষ ২০১২ সালের ১৯ জুলাই কৃষক লীগের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন হয়। সেই কমিটিতে সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লা ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন অ্যাডভোকেট শামসুল হক রেজা। মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তারা। কৃষক লীগের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭২ সালের ১৯ এপ্রিল। প্রতি তিন বছর পর পর সম্মেলন করার কথা থাকলেও ৪৭ বছরে মোট ছয়বার সম্মেলন হয়েছে কৃষক লীগের।
যুবলীগও প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো ৪৭ বছর আগে। এই পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সম্মেলন হয়েছে ছয়বার। সর্বশেষ কেন্দ্রীয় সম্মেলন হয় ২০১২ সালের ১৪ জুলাই। ওই কাউন্সিলে যুবলীগের বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক পদে মো. হারুনুর রশিদকে দায়িত্ব দেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুবলীগের গঠনতন্ত্রে তিন বছর পরপর সম্মেলন করার কথা। আগামী ২৩ নভেম্বর যুবলীগের সপ্তম কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
১৯৯৪ সালের ২৭ জুলাই ছাত্রলীগের বিভিন্নপর্যায়ের সাবেক নেতাদের সমন্বয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগ প্রতিষ্ঠা করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিষ্ঠার ৯ বছর পর ২০০৩ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে আসেন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। সাধারণ সম্পাদক হন পঙ্কজ দেবনাথ এমপি।
সর্বশেষ সম্মেলন হয় ২০১২ সালের ১১ জুলাই। দায়িত্বে আসেন মোল্লা মো. আবু কাওসার। সাধারণ সম্পাদক পদে পুনরায় আসেন পঙ্কজ দেবনাথ এমপি। আগামী ১৬ নভেম্বর স্বেচ্ছাসেবক লীগের তৃতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
শ্রমিক লীগের বর্তমান কমিটির সভাপতি শুক্কুর মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম। তারা দুজনেই সংগঠনের দায়িত্ব পেয়েছিল ২০১২ সালের জুলাই মাসে। এরপর ওই নেতৃত্বের হাত ধরেই শ্রমিক লীগের রাজনীতি চলছে। নেতৃত্বের দীর্ঘ এই সময়ে সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। আগামী ৯ নভেম্বর জতীয় শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ সবসময় ত্যাগী ও মেধাবী নেতৃত্বকে এগিয়ে রাখে। এবারো ব্যতিক্রম হবে না, সহযোগী সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
আজকালের কন্ঠ /এএ/এমএম