বাগেরহাট প্রতিনিধি : আজ ৪ অক্টোবর দেবী বোধনের মধ্যে দিয়ে শারদীয় দূর্গোৎসবের পূর্ণঙ্গ সূচনা হবে জেলার ৬৩০ টি মন্ডপে । দেবীদূর্গা এবছর ঘোড়ায় চড়ে বাবার বাড়িতে আসলেও শিকদার বাড়ী মন্ডপে দেবীর সাথে থাকবে ৮০১ জন দেব-দেবী। আর ৮ অক্টোবর বিজয়াদশমীর মধ্যে দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে ফিরে যাবেন আপন গৃহে। তবে মহালায়া-ই পূন্যলগ্ন,দেবী পক্ষের শুরু এদিন দেবীর দৃষ্টিদান,চন্ডিমন্ত্র জপের মাধ্যমেই দেবীর আগমনী পদ ধ্বনী শোনাযায় । উৎসবের মুল কৃয়া-কর্ম শুরু আজ দেবীর বোধন।
শুরু হয়েছে ঢাকের বাড়ী, শাঁেখর ধ্বনী, নারীদের উলুতে মুখরিত হয়েছে সকল মন্ডপ, সিকদার বাড়ীর পুজা মন্ডপের ধুপের ধোয়ায় সমস্ত হাকিমপুর পাড়া জুড়ে যেন আলাদা একটা আনন্দের আমেজ বইছে। এ মন্ডপের মৃৎ শিল্পের কারিগররা তাদের নিপূণ হাতে দূগতী নাশনিী দেবী দূর্গাসহ নানা দেবদেবীর প্রতিমা তৈরির সব কাজ শেষ করেছে যথা সময়ে। অধিক পরিমানে দেব-দেবীর প্রতিমা আর নিপুণ কারুকার্য্য খচিত অলংকরণ সাথে থাকছে ভিন্ন আমেজে নানান মনোজ্ঞ আয়োজন।আয়েজন সাজ-সজ্জা আর কঠোর নিরাপত্তায় দেশ বিদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বাগেরহাটের সিকদার বাড়ীর দূর্গোৎসবটি দেশের মধ্যে এখন অন্যতম স্থান করে নিয়েছে ।
মহাভারত ও রামায়নের ৪ যুগের অবতরদের সৃষ্টির রহস্য এবং লিলা কাহীনি দিয়ে সাজানো বাগেরহাটের হাকিম পুর সিকদার বাড়ীর মন্ডপের জন্য এই জেলার নামটি এখন সবার কাছে কমবেশি পরিচিত। গত নয় বছর ধরে বাগেরহাট সদর উপজেলার প্রত্যন্ত খানপুর ইউনিয়নের হাকিমপুর গ্রামের সিকদার বাড়িতে পারিবারিক উদ্যোগে দেশের সবচেয়ে বড় পূজার আয়োজন করে আসছেন। এবছর এই মন্ডপে ৮০১টি প্রতিমা নির্মান করা হয়েছে। দূর্গাপূজায় আসলেই এখানে দর্শনার্থীদের ভিড় সবচেয়ে বেশি থাকে। তবে জেলার সার্বজনীন পূজা মন্ডপগুলোও দর্শনার্থীদের ধরে রাখতে ওই প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে নেই। তারাও তাদের মন্ডপে দর্শনার্থীদের টানতে প্রতিমার সংখ্যা বাড়াচ্ছেন। সিকদারবাড়ির পরেই বাগেরহাটে কাড়াপাড়া সার্বজনীন রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমে এবছর ৩০১টি প্রতিমা, ফকিরহাটের বেতাগা গ্রামের মমতলা সার্বজনীন পূজা মন্ডপে এবং চুলকাঠি বণিকপাড়া সার্বজনীন পূজা মন্ডপে ১০১টি করে প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে।
প্রধান কারিগর বিজয় কৃষ্ণ বাছাড় এই প্রতিনিধিকে বলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী যারা মহাভারত ও রামায়নের সবটা জানেন না ধর্মের সেই অজানা নানা কাহিনী তুলে ধরতে এসব প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবছরই এই মন্ডপে নতুন কিছু যোগ হয়। এর আগে সত্য, ত্রেতা, দাপর ও কলি যুগের অবতরদে কাহিনী অবলম্বনে প্রতিমা তৈরি করা হয়। এবছর নতুনত্বের মধ্যে থাকছে দেব দেবিদের সৃষ্টি রহস্য। এসব দেখে দর্শনার্থীরা আনন্দ পাবেন এবং সনাতন ধর্ম সম্পর্কে জানতে পারবে বলে জানান ওই কারিগরের।
মন্ডপ সংলগ্ন হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফিরোজ আহমেদ এই প্রতিনিধিকে বলেন, শারদীয় দূর্গাপূজার বড় আয়োজনের কারনে হাকিমপুর গ্রামের সিকদারবাড়ি এখন সারাদেশে পরিচিত নাম। এখানে পুজার সময় দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের সমাগম ঘটে। পূজা আসলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক মিলন মেলায় পরিণত হয় এই গ্রামটি।
৪ যুগের অবতরদের আয়োজক ব্যবসায়ি লিটন সিকদার এই প্রতিনিধিকে বলেন, প্রথম ২০১১ সালে ১৫১টি প্রতিমা তৈরি করে এই পূজা মন্ডপে শারদীয় দূর্গোৎসব শুরু করি। সনাতন ধর্মে কোটি কোটি দেবতা রয়েছে। আমরা অনেকেই এসব দেবতাদের নাম জানিনা। আমি চেষ্টা করছি সনাতন ধর্মের এসব দেবতাদের পরিচয় করিয়ে দিতে প্রতিবছর প্রতিমার সংখ্যা বাড়াচ্ছি। আমি চাই এই মন্ডপে ধর্মানুরাগীরা এবং দর্শনার্থীরা এসে জানুক রামায়ন ও মহাভারতের মূল ইতিহাস। আমার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে প্রতিবছর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সুধীজনরাও এখানে ঘুরতে আসেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। পূজার পাঁচদিন নানা অনুষ্ঠানে ভক্ত দর্শনার্থীদের পদচারণায় মূখরিত হয়ে ওঠে হাকিমপুর গ্রামটি।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সহ সভাপতি অম্বরিশ রায় এই প্রতিনিধিকে বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সেতু বন্ধন হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দূর্গাপূজা। বাগেরহাট জেলার অন্যতম আকর্ষণ ব্যক্তি উদ্যোগে বড় পূজার আয়োজন হয় সিকদারবাড়িতে। এ জেলায় আরো বেশ কয়েকটি মন্ডপ দর্শনার্থীদের টানতে বেশিবেশি প্রতিমা তৈরি করছেন। সব মিলিয়ে চারিদিকে একটা উৎসবের আমেজ। সরকারের সহযোগিতায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দূর্গাপূজাটি আনন্দঘন হবে বলেই মনে করেন এই নেতা।
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ্র রায় এই প্রতিবেদককে বলেন, বাগেরহাটে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দূর্গাপূজাটি আনন্দঘন ও উৎসব মূখর পরিবেশে প্রতিবছর হয়ে আসছে। জেলার নয় উপজেলায় এবছর মোট ৬২৪টি মন্ডপে দূর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। দেশের সবচেয়ে বড় পূজাটি হয় সিকদারবাড়িতে। এখানে বিপুল পরিমান দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে। প্রতিমা তৈরির কাজ শুরুর পর থেকেই স্থানীয় লোকজন, গ্রাম পুলিশ ও থানা পুলিশ মন্ডপে মন্ডপে নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দূর্গাপূজা যেন নির্বিঘেœ তারা করতে পারেন সেজন্য পুলিশ মোতায়েন করা হবে। বাড়তি নিরাপত্তা হিসেবে সিসিটিভি দ্বারা পূজা মন্ডপগুলো মনিটরিং করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।