Header
প্রিন্ট তারিখঃ নভেম্বর ৭, ২০২৬ , ২:০৪ অপরাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ নভেম্বর ৭, ২০২৬ , ১:৩৮ অপরাহ্ণ

আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬ঃ বিশ্ব রাজনীতির নতুন মোড়

লেখকঃ অধ্যাপক ড. শেখ আসিফ এস. মিজান

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ‘মিডটার্ম’ বা মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল ক্ষমতার রদবদল কিংবা আইনসভার আসন দখলের কোনো সাধারণ গণতান্ত্রিক মহড়া নয়; বরং এটি মার্কিন রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তর্নিহিত ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা ক্ষমতার ভারসাম্য ব্যবস্থার এক সর্বোচ্চ পরীক্ষা। চার বছরের প্রেসিডেনশিয়াল মেয়াদের ঠিক মধ্যবিন্দুতে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন সবসময়ই ক্ষমতাসীন প্রশাসনের নীতি, আদর্শ এবং শাসনপদ্ধতির ওপর জনগণের সরাসরি গণরায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ এবং ক্ষমতার সমীকরণে এক সুদূরপ্রসারী বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে। আমেরিকান ভোটাররা ব্যালটের মাধ্যমে যে রায় দিয়েছেন, তা কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মোড়ই ঘুরিয়ে দেয়নি, বরং হোয়াইট হাউসের একচ্ছত্র নির্বাহী ক্ষমতার ওপর একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক লাগাম টেনে ধরেছে।

সাংবিধানিক দর্শন ও ক্ষমতার ভারসাম্য

মার্কিন দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা—কংগ্রেসের কাঠামো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল যাতে কোনো একক জনপ্রিয় রাজনৈতিক তরঙ্গ বা তাৎক্ষণিক আবেগের বশে রাষ্ট্র পরিচালনা হোঁচট না খায়। প্রতিনিধি সভার সদস্যরা জনগণের তাৎক্ষণিক অনুভূতির প্রতিনিধিত্ব করলেও, সিনেট কাজ করে একটি ‘স্থায়ী ও ধারাবাহিক পরিষদ’ হিসেবে। আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন ও জেমস ম্যাডিসনদের সেই দূরদর্শী সাংবিধানিক দর্শন আজো মার্কিন গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি অনুযায়ী, বাজেট প্রণয়ন, শুল্ক নির্ধারণ এবং অর্থায়নের একচ্ছত্র ইখতিয়ার কংগ্রেসের হাতে ন্যস্ত। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট যদি তাঁর নিজ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারান, তবে প্রশাসনিক গতিশীলতায় যে সাংবিধানিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়, তা মার্কিন গণতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের পক্ষেই এক ধরনের সুরক্ষা কবচ।

২০২৬ সালের এই নির্বাচনে ভোটাররা রেকর্ড সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে প্রতিনিধি সভার নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্রেটিক পার্টির হাতে তুলে দিয়েছেন এবং সিনেটেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার নতুন বিন্যাস নিশ্চিত করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক বিপর্যয় নয়; বরং এটি মার্কিন সংবিধানের অন্তর্নিহিত ভারসাম্য ব্যবস্থার এক শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ। প্রখ্যাত মার্কিন দৈনিক দ্য ওয়াশিংটন Post-এর বিশ্লেষণে যেমনটি উঠে এসেছে—“আমেরিকান ভোটাররা ট্রাম্পের লাগামহীন ক্ষমতার ওপর একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্রেক কষে দিয়েছেন। এটি হোয়াইট হাউসের একচ্ছত্র সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মার্কিন সংবিধানের মূল চেতনারই এক জোরালো পুনরুজ্জীবন।”

অভ্যন্তরীণ নীতি ও পপুলিজমের সীমারেখা

কংগ্রেসের নতুন ক্ষমতা বিন্যাস যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মৌলিক কাঠামোগুলোতে নাটকীয় পরিবর্তন আনবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের আগ্রাসী শুল্কনীতি, নির্বাহী আদেশের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং পপুলিস্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে এখন আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক দেওয়াল তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের অপব্যবহার করে নির্বিচারে শুল্ক আরোপের প্রবণতায় লাগাম টানবে ডেমোক্রেটিক নেতৃত্ব। ২০১৭ সালের করপোরেট কর ছাড়ের মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা এবং ধনী ও বড় করপোরেশনগুলোর ওপর পুনরায় কর আরোপের দাবি এখন জোরালো হবে। এছাড়া, স্বাস্থ্যসেবা (যেমন ওবামাকেয়ার সুরক্ষা) এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে প্যারিস চুক্তির ধারাবাহিকতা রক্ষায় বাজেটের অনুমোদন আটকে দিয়ে প্রশাসনকে নতুন সমঝোতায় আসতে বাধ্য করা হবে।

বিচার বিভাগীয় নিয়োগের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসনের একচ্ছত্র প্রভাব খর্ব হয়েছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্রেটদের হাতে যাওয়ায় ফেডারেল আদালত ও সুপ্রিম কোর্টে কট্টর ডানপন্থী বিচারক বসানোর পথ এখন অনেকটাই সংকুচিত। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী—“ট্রাম্পের পপুলিজমের একটি স্পষ্ট নির্বাচনী সীমারেখা রয়েছে। এই পরাজয় রিপাবলিকান পার্টির ভেতরের মাঝারি ও মূলধারার রক্ষণশীল অংশকে ২০২৮ সালের জন্য ট্রাম্পের বিকল্প নেতৃত্বের সন্ধানে সোচ্চার করে তুলেছে।” ফলশ্রুতিতে, ডেসান্টিস কিংবা নিকি হেলির মতো উদীয়মান মধ্যপন্থী নেতারা ট্রাম্পের একক আধিপত্যকে প্রকাশ্যেই চ্যালেঞ্জ করার মধ্য দিয়ে রিপাবলিকান পার্টিকে এক আদর্শিক লড়াইয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন।

পররাষ্ট্রনীতি ও বৈশ্বিক কূটনীতির নতুন সমীকরণ

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফলাফল বিশ্ব রাজনীতি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। বিশ্বখ্যাত থিঙ্কট্যাংক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন-এর বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের এই নতুন নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক কূটনীতিতে আকস্মিক ও হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে আনবে।

১. মধ্যপ্রাচ্য ও যুদ্ধ ক্ষমতা আইন:
ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সামরিক পদক্ষেপ বা একতরফা সামরিক সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি এখন ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন’ বা যুদ্ধ ক্ষমতা আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে আইনিভাবে প্রতিহত করা সম্ভব হবে। হোয়াইট হাউসকে এখন মিত্র দেশগুলোর সাথে পরামর্শ করে কূটনৈতিক আলোচনার পথে হাঁটতে হবে।
২. চীন ও বাণিজ্য নীতি:
বেইজিংয়ের সাথে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বজায় থাকলেও, হুট করে শুল্ক বাড়ানোর মতো একতরফা বাণিজ্য যুদ্ধ শিথিল হবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মকানুন এবং মিত্রদের সাথে নিয়ে কাঠামোগত অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হবে।
৩. ইন্দো-প্যাসিফিক ও দক্ষিণ এশিয়া:
কোয়াড জোটের গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ থাকলেও ট্রাম্পের ‘একলা চলো’ নীতিতে সংযত ভাব আসবে। দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর সাথে বাণিজ্যিক ও সামরিক সহযোগিতায় পরিবেশগত জলবায়ু সহযোগিতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো জোরালোভাবে যুক্ত হবে।
৪. ন্যাটো ও ইউরোপীয় মিত্রতা:
ইউরোপীয় নিরাপত্তা স্থাপত্যকে পাশ কাটানোর যেকোনো সিদ্ধান্তের পথ রুদ্ধ থাকায় ওয়াশিংটন এবং ব্রাসেলসের মধ্যকার ঐতিহাসিক ট্রান্সআটলাটিক সম্পর্ক ও বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে আস্থার নতুন যুগের সূচনা হয়েছে।

অতএব, ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল ওয়াশিংটনের আইনসভার আসন বিন্যাসের কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এটি আধুনিক গণতান্ত্রিক ইতিহাসে প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের এক অনন্য নজির। অপরাধবিজ্ঞান ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ হিসেবে মনে করি, যখনই রাষ্ট্রে নির্বাহী ক্ষমতার ওপর আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি শক্তিশালী হয়, তখনই ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ কমে আসে এবং সুশাসন ও মানবাধিকারের পথ সুগম হয়। আমেরিকান জনগণের এই রায় প্রমাণ করেছে যে, কোনো একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক পপুলিস্ট এজেন্ডা যুক্তরাষ্ট্রের সুদীর্ঘ সাংবিধানিক কাঠামো এবং ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে নয়। এই ফলাফল বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার ভূমিকা আরও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক, নিয়মতান্ত্রিক ও বহুপাক্ষিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে এক অনন্য অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।

লেখকঃ অধ্যাপক ড. শেখ আসিফ এস. মিজান
উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া; অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ।

আজকালের কন্ঠ/আর বি

প্রিন্ট করুন