ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হঠাৎ একযোগে ৫৬ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীকে বদলির ঘটনায় প্রশাসনের অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এই বদলিকে কেন্দ্র করে সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। অভিযোগ উঠেছে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাউছার আহমেদ ও জেলা নাজির আরিফুর রহমানের কথিত প্রভাববলয় বা ‘কাউছার-আরিফ সিন্ডিকেটের’ বাইরে থাকা কর্মচারীদেরই মূলত বদলির খড়্গের মুখে পড়তে হয়েছে। অন্যদিকে, তাঁদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মচারী আগের কর্মস্থলেই বহাল রয়েছেন।
সোমবার (২ নভেম্বর) জেলা প্রশাসনের নেজারত শাখা থেকে জারি করা আদেশে দপ্তরি, অফিস সহায়ক ও প্রসেস সার্ভার পদে কর্মরত মোট ৫৬ জনকে একযোগে বদলি করা হয়। বদলির তালিকায় রয়েছেন ৬ জন দপ্তরি, ২৬ জন অফিস সহায়ক এবং ২৪ জন প্রসেস সার্ভার। আগামী ৮ নভেম্বর পূর্বাহ্ণে বদলিকৃত কর্মস্থলে তাঁদের যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই দিনে এত বিপুলসংখ্যক কর্মচারীর বদলির ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে কী কারণে এবং কোন প্রশাসনিক বিবেচনায় এই গণবদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? বদলির ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান নীতি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে বিতর্ক।
কর্মচারীদের একাংশের অভিযোগ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাউছার আহমেদ ও জেলা নাজির আরিফুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এমন কয়েকজন কর্মচারীকে কৌশলে আগের কর্মস্থলে বহাল রাখা হয়েছে। এমনকি তাঁদের অন্যত্র বদলি দেখানো হলেও বাস্তবে আগের জায়গায় কাজ করার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে যাঁদের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দপ্তরি হেলিম মৃধা, সুশান্ত রায়। অফিস সহায়ক পুলক চন্দ্র রায়, সুহেল আহমেদ ও সেন্টু লাল দাস এবং প্রসেস সার্ভার ইসমাইল মিয়া, মো. নজরুল ইসলাম, নোয়াব মিয়া, মানিক মিয়া, রফিকুল ইসলাম, রতন মিয়া, হাবিবুর রহমান ও আলী আক্কাসসহ আরও কয়েকজন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একজন কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের অফিস চলে এখন কাউছার-আরিফের কথায়। তাঁদের কথায় স্যাররা রাতকে দিন, দিনকে রাত করেন। সাধারণ কর্মচারীদের দুঃখ-দুর্দশা বোঝার যেন কেউ নেই। কারও সঙ্গে সু-সম্পর্ক থাকলে তাঁর জন্য এক নিয়ম, আর সাধারণ কর্মচারীদের জন্য আরেক নিয়ম। এই পরিস্থিতিতে আমরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।
ওই কর্মচারীর অভিযোগ, বদলি নিয়ে এক ধরনের প্রভাব বিস্তার ও বাণিজ্যের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তবে কথিত বদলি বাণিজ্যের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
কর্মচারীদের একাংশের প্রশ্ন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাউছার আহমেদ প্রায় ২১ বছর ধরে একই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে জেলা নাজির আরিফুর রহমান আরিফের কর্মকালও প্রায় ৭-৮ বছর বলে জানা গেছে।
দীর্ঘদিন একই কার্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার কারণে তাঁদের প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন কর্মচারীদের কেউ কেউ। তাঁদের দাবি, প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাউছার আহমেদের বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে একাধিক অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র। এ ছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমেও তাঁকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা, তদন্তের অগ্রগতি কিংবা কোনো কর্তৃপক্ষের গৃহীত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে জেলা নাজির আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন একই কার্যালয়ে কর্মরত থাকা এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলেছেন কর্মচারীদের একটি অংশ।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং প্রশাসনিক নিয়মনীতি অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। সেখানে একই দিনে ৫৬ জন কর্মচারীর বদলি এবং কিছু কর্মচারীকে ঘিরে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
কর্মচারীদের প্রশ্ন, বদলির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে, নাকি ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ প্রাধান্য পেয়েছে? অভিযোগগুলো সত্য হলে এর পেছনে কারা দায়ী? আর অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হলে প্রশাসনের উচিত তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত, বদলির আদেশের যৌক্তিকতা পর্যালোচনা এবং অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা।
এ বিষয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাউছার আহমেদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অন্যদিকে, জেলা নাজির আরিফুর রহমান ডিসি অফিসে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি জানান, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বিভিন্ন শাখা একেকটি মন্ত্রণালয়ের অধীন। তিনি দীর্ঘদিন এসএ শাখার নাজির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে জেলা নাজির হিসেবে গত ২ বছর ২ মাস ধরে কর্মরত রয়েছেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ বলেন, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে পর্যায়ক্রমে সবাইকে বদলি করা হবে।
তিনি আরও জানান, প্রশাসনের কাজে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনতে এ ধরনের পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।
আজকালের কন্ঠ/আর বি