আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি সর্বদা পারিপার্শ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং ভূ-অর্থনীতির মিথস্ক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে আবর্তিত হয়। কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের দ্বিপাক্ষিক সফর কেবলই প্রথাগত কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং তা বৈশ্বিক বাস্তবতায় দেশের অবস্থান সুসংহত করার এক দূরদর্শী প্রয়াস। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বর্তমান ৪ দিনের জাপান সফরকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই তাত্ত্বিক আলোকেই বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ২৬ অক্টোবর ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া এই সফরটি এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সংস্কার সাধন করে এক নতুন উদীয়মান অর্থনীতির মহাসড়কে পদার্পণ করছে। জাপান ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের এক অকৃত্রিম বন্ধু, সবচেয়ে বড় দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগী ও অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ককে এক অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করার যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
ঐতিহাসিক বন্ধন ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিবর্তন
বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের শেকড় প্রোথিত রয়েছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গভীর আস্থার ওপর। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের পর, প্রথম দিকের উন্নত দেশগুলোর অন্যতম হিসেবে ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাপান বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে। এই ঐতিহাসিক যাত্রার ধারাবাহিকতায়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ ও ১৯৮০ সালে জাপান সফর করেছিলেন—যা দুই দেশের সম্পর্কের সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি স্থাপন করেছিল। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৪ ও ২০০৫ সালে দেশটির সাথে সম্পর্কের পরিধি আরও বিস্তৃত করেন। ২০২৩ সালে দুই দেশের সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ (Strategic Partnership)-এর স্তরে উন্নীত করা হয় এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক ‘অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ (EPA) এই সম্পর্ককে এক নতুন আইনি ও বাণিজ্যিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর মূলত সেই ঐতিহাসিক পরম্পরাকে ধারণ করে ‘নতুন বাংলাদেশের’ জন্য এক আধুনিক ও কৌশলগত রূপরেখা বিনির্মাণ করছে।
ভূ-অর্থনৈতিক সমীকরণ: ‘সাহায্য নির্ভরতা’ থেকে ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নব্য-বাস্তববাদী (Neo-realist) তত্ত্ব অনুযায়ী, যেকোনো বৈদেশিক সম্পর্কের মূলে থাকে অর্থনৈতিক ও জাতীয় সমৃদ্ধির বিবেচনা। বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই ভূ-অর্থনৈতিক গতিশীলতা গভীরভাবে দৃশ্যমান। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সাম্প্রতিক বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, “সহায়তা বা এইড-ডিপেন্ডেন্সির যুগ শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন আর সাহায্য-নির্ভর অর্থনীতি চায় না, বরং বিভিন্ন দেশের সাথে সমতা ও অংশীদারত্বের ওপর জোর দিচ্ছে।”
এই সফরের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি হলো বেসরকারি খাতের জন্য জাপানের ব্যাপক বিনিয়োগের ঘোষণা। টোকিওতে দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকের পর জানা গেছে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের অবকাঠামো ও বিভিন্ন শিল্পে প্রায় সাড়ে ছয় বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগের বড় ধরনের আর্থিক রূপরেখা আসতে যাচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন কৃষি, ওষুধ শিল্প, আইসিটি ও ব্লু-ইকোনমি খাতের জন্য আরও ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাবসহ মোট ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজ নিয়ে দুই দেশের নীতিনির্ধারকেরা কাজ করছেন। জাইকা (JICA)-এর মাধ্যমে এ পর্যন্ত জাপান প্রায় ৩৩.৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ওডিএ (ODA) বা উন্নয়ন সহায়তা প্রদান করেছে, যার সুফল আমরা ঢাকা মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষ করছি। বর্তমান সফরের মধ্য দিয়ে জাপানের ৩৩৮টি সক্রিয় কোম্পানির পাশাপাশি ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ (China Plus One) কৌশলের অধীনে আরও বহু জাপানি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তাদের শিল্পকারখানা স্থানান্তরে আগ্রহী হচ্ছে।
ভূ-রাজনীতি ও বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব
বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যে শক্তির ভারসাম্য রক্ষার প্রতিযোগিতা চলছে, সেখানে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন, “বাংলাদেশকে গভীরভাবে সমর্থন করে জাপান। বে অব বেঙ্গল বা বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে টোকিও অত্যন্ত আগ্রহী।” জাপানের ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ (FOIP) ভিশন বাস্তবায়নে এবং তাদের ‘বিগ-বি’ (BIG-B বা Bay of Bengal Industrial Growth Belt) উদ্যোগের সফলতায় বাংলাদেশের দক্ষিণ চট্টগ্রাম তথা মাতারবাড়ি অঞ্চলের উন্নয়ন অপরিহার্য। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও এই সম্পর্ক এখন বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে জাপানের ‘অফিসিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্স’ (OSA) ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নজরদারি সক্ষমতা বাড়াতে ৫টি অত্যাধুনিক টহল জাহাজ সরবরাহ করেছে জাপান। এটি প্রমাণ করে যে, দুই দেশের সম্পর্ক কেবল বাণিজ্যিক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার এক অভিন্ন প্রতিশ্রুতিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ
একজন অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি মনে করি, যেকোনো টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পূর্বশর্ত হলো সুশাসন ও বিনিয়োগের জন্য একটি নিরাপদ, দুর্নীতিমুক্ত ও স্থিতিশীল পরিবেশ। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যে গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সূচনা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। জাপান অত্যন্ত সুচারুভাবে বাংলাদেশের এই সুশাসনের অভিযাত্রাকে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং তাদের এই বিপুল বিনিয়োগের আগ্রহ মূলত বাংলাদেশের বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি বৈশ্বিক আস্থারই বহিঃপ্রকাশ।
তদুপরি, মানবাধিকার ও মানবিক নিরাপত্তার একটি বড় সংকট হলো রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা। এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেনোসাইডের শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন জরুরি, যা জাপানি প্রধানমন্ত্রীও পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এই মানবিক সংকটের টেকসই সমাধানে জাপানের মতো পরাশক্তির সক্রিয় ভূমিকা ও কূটনৈতিক চাপ আঞ্চলিক অপরাধপ্রবণতা হ্রাস ও ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করবে।
মানবসম্পদ উন্নয়ন ও যৌথ সমৃদ্ধির ভবিষ্যৎ
একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হলো তার মানবসম্পদ। বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশের এক স্বর্ণালী সময় পার করছে, যেখানে যুবশক্তির আধিক্য রয়েছে। অন্যদিকে জাপান তীব্র শ্রমঘাটতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পারস্পরিক চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবরে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে পাঁচ বছর মেয়াদী ‘এমপ্লয়মেন্ট স্কিলস ডেভেলপমেন্ট মেমোরেন্ডাম অব কোঅপারেশন’ (ESDP-MoC)। এর ফলে ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে জাপানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে অন্তত ১ লক্ষ দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের এক অবারিত সুযোগ তৈরি হয়েছে। জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকা এবং জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের সভাপতি তারো আসোর সাথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ফলপ্রসূ বৈঠক বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে জাপানি প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা পাওয়ার পথকে আরও প্রশস্ত করেছে।
অতএব, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই টোকিও সফর কেবল প্রথাগত কূটনীতির পরিধি ছাড়িয়ে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে—যা দুই দেশের অংশীদারত্বকে যৌথ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৌশলগত ঐক্যের এক দৃঢ় চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করবে। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সেই আশাবাদই আজ কোটি বাংলাদেশির প্রত্যাশা: “বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্ব কয়েক দশকের বন্ধুত্ব, আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। আজ এই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ এসেছে।” অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মেগা প্রকল্পগুলোর সফল সমাপ্তি এবং টেকসই উন্নয়ন সুনিশ্চিত করে টোকিও ও ঢাকার এই ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অক্ষ উদীয়মান এশিয়ায় এক নতুন স্থায়ী উত্তরাধিকার রেখে যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
লেখক পরিচিতি:
প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান
উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া; এবং অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ।