মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত বৈচিত্র্যের মেলবন্ধনের ইতিহাস। আদিম সমাজ থেকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা—সবখানেই বহুত্ববাদ (Pluralism) सामाजिक স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একজন মানবাধিকার কর্মী এবং অপরাধবিজ্ঞানের গবেষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, সমাজের অপরাধপ্রবণতা হ্রাস ও টেকসই শান্তি বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) সামাজিক মনস্তত্ত্বের মধ্যে। আমাদের বাংলাদেশে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ নানা ধর্মের মানুষ শতাব্দীকাল ধরে পরম মমতায় একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে বসবাস করছে। এই প্রেক্ষাপটে, অমুসলিম প্রতিবেশীদের ধর্মীয় উৎসব ও সামাজিক আয়োজনে শুভেচ্ছা জানানো, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সৌহার্দ্য প্রদর্শনের বিষয়টি ইসলামি শরিয়াহ, মানবাধিকার এবং সুশাসনের আলোকে কেমন হওয়া উচিত—তা গভীর তাত্ত্বিক ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
বৈচিত্র্য আল্লাহর সৃষ্টিগত নিয়ম: একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি
ইসলামে বহুত্ববাদ বা বৈচিত্র্যকে কোনো আকস্মিক ঘটনা হিসেবে দেখা হয়নি, বরং একে মহান আল্লাহর এক সুনিপুণ পরিকল্পনা ও সৃষ্টির অন্যতম নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে:
“হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরহেজগার।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)
এই আয়াতটি সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি বর্ণবাদ, গোত্রবাদ এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে পারস্পরিক জানাশোনা (تعارف – তা’আরুফ) এবং মানবিক যোগাযোগের এক শাশ্বত দর্শন উপস্থাপন করে। অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে, প্রত্যেকে নিজ নিজ বিশ্বাসের প্রতি দায়বদ্ধ এবং বিশ্বাসের এই ভিন্নতা আল্লাহরই ইচ্ছাধীন (সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৮)। অতএব, ভিন্নধর্মী প্রতিবেশীর অস্তিত্বকে মেনে নেওয়া এবং তাদের সাথে মানবিক সম্পর্ক বজায় রাখা একজন মুমিনের মৌলিক সামাজিক কর্তব্যের অংশ।
অমুসলিম প্রতিবেশীদের সাথে সদাচরণ: কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা
ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকারকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “জিবরাইল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে এত বেশি তাগিদ দিচ্ছিলেন যে, আমার মনে হচ্ছিল হয়তো প্রতিবেশীকে সম্পদের উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি)। এখানে প্রতিবেশী বলতে কেবল মুসলিম প্রতিবেশী বোঝানো হয়নি, বরং সব ধর্মের মানুষ এর অন্তর্ভুক্ত।
পবিত্র কোরআনের সুষ্পষ্ট নীতি হলো, যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত নয়, তাদের সাথে ন্যায়বিচার ও চমৎকার সৌজন্যমূলক আচরণ করতে হবে:
“ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাфকারীদের ভালোবাসেন।” (সূরা আল-مুমতাহিনা: ০৮)
ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিবেশীর সামাজিক বা ধর্মীয় উৎসবে তাদের মানবিক আনন্দ-বেদনার অংশী হওয়া, বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং সামাজিক সৌজন্য হিসেবে শুভেচ্ছা বিনিময় করা এই ‘সদাচরণ’ (بر – বির) এবং ‘ন্যায়বিচারে’রই বহিঃপ্রকাশ।
মদিনা সনদ ও মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক দলিল
পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদিনা সনদ’ (Constitution of Medina)-এর দিকে তাকালে আমরা সুশাসনের এক অনন্য নজির দেখতে পাই। এই সনদের ২৫ নম্বর ধারায় রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন: “বনু আউফ (ইহুদি সম্প্রদায়)-এর লোকেরা মুসলিমদের সাথে একই উম্মত (বা রাষ্ট্রীয় সমাজ) হিসেবে গণ্য হবে। ইহুদিদের জন্য তাদের ধর্ম এবং মুসলিমদের জন্য তাদের ধর্ম।”
মক্কা বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা এবং খলিফা ওমর (রা.)-এর জেরুজালেম বিজয়ের পর খ্রিস্টানদের সাথে সম্পাদিত ‘আহদ নামা’ বা শান্তিচুক্তি প্রমাণ করে যে, অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, উপাসনালয়ের নিরাপত্তা এবং নাগরিক মর্যাদা রক্ষা করা ইসলামের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। খলিফা ওমরের সেই বিখ্যাত চুক্তিতে উল্লেখ ছিল—খ্রিস্টানদের গির্জা ধ্বংস করা হবে না, তাদের ধর্মীয় ক্রুশ বা কোনো প্রতীকের ক্ষতি করা হবে না এবং তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে কোনো জোরজুলুম করা হবে না।
উৎসবের সামাজিক মাত্রা ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের পরিধি
ধর্মীয় উৎসবগুলোর দুটি দিক থাকে: একটি হলো আকীদাগত বা উপাসনামূলক (Ritualistic), অন্যটি হলো সামাজিক বা মানবিক (Social & Cultural)। একজন মুসলিম হিসেবে আমরা অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করব না—সেটি আমাদের নিজস্ব বিশ্বাসের স্বাধীনতা (Freedom of Belief)। কিন্তু প্রতিবেশী যখন কোনো উৎসবে আনন্দিত হন, তখন সামাজিক সুসম্পর্ক ও শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে তাকে শুভেচ্ছা জানানো (“আপনার দিনটি আনন্দের হোক” বা “शुभ कामना”) কোনোভাবেই ইসলামের মূল বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।
মিশরের বিশ্ববিখ্যাত ফতোয়া বোর্ড ‘دارুল ইফতা আল-মিসরিয়্যাহ’ এবং সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামি চিন্তাবিদ ও ফকিহ ড. ইউসুফ আল-কারাদাভি এই বিষয়ে অত্যন্ত যুগান্তকারী ও উদার ফতোয়া দিয়েছেন। ড. কারাদাভি তাঁর ‘আল-হালাল ওয়াল হারাম ফিল ইসলাম’ গ্রন্থে এবং বিভিন্ন ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন:
“মুসলিমদের জন্য তাদের অমুসলিম প্রতিবেশীদের, বিশেষ করে যারা তাদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে, তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে শুভেচ্ছা জানানো কেবল জায়েজই নয়, বরং তা ইসলামের সৌজন্যবোধ এবং দাওয়াহ-র (ইসলামের সৌন্দর্য প্রদর্শন) একটি চমৎকার মাধ্যম।”
একইভাবে ইউরোপীয় ফতোয়া কাউন্সিল (European Council for Fatwa and Research)-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাশ্চাত্য বা মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে অমুসলিমদের সাথে সামাজিক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্বার্থে সৌজন্যমূলক শুভেচ্ছা বিনিময় করা একটি প্রশংসনীয় কাজ।
বৈষম্যহীন সমাজ ও মানবাধিকারের চেতনা
অপরাধবিজ্ঞানের একটি মৌলিক তত্ত্ব হলো—যে সমাজে বর্জন (Social Exclusion) এবং বৈষম্য বেশি, সেখানে আন্তঃব্যক্তিক সংঘাত ও অপরাধের হার বেশি। পক্ষান্তরে, যে সমাজ অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং যেখানে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নিজেদের নিরাপদ ও সম্মানিত বোধ করে, সেখানে সামাজিক পুঁজি (Social Capital) এবং সুশাসন সুদৃঢ় হয়।
ইসলামী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক অধ্যাপক ড. তারিক রামাদান বহুত্ববাদী সমাজে মুসলিমদের ভূমিকা নিয়ে বলতে গিয়ে লিখেছেন: “আমাদের কেবল সহনশীল (Tolerant) হলে চলবে না, আমাদের পারস্পরিক মর্যাদাবোধ (Mutual Respect) তৈরি করতে হবে। আর এই মর্যাদা আসে অন্যকে জানার এবং তাদের আনন্দের মুহূর্তগুলোকে সম্মান করার মধ্য দিয়ে।”
অতএব, একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও সুশাসিত সমাজ বিনির্মাণে ধর্মীয় সম্প্রীতির কোনো বিকল্প নেই। আমাদের মনে রাখতে হবে, অমুসলিম প্রতিবেশীকে শুভেচ্ছা জানানো বা তাদের সামাজিক আয়োজনে সহযোগিতা করার অর্থ এই নয় যে আমরা আমাদের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাসে ছাড় দিচ্ছি; barat এর অর্থ হলো আমরা ইসলামের সেই মহান মানবিক আদর্শকে তুলে ধরছি, যা মানুষকে মানুষের মর্যাদা দিতে শেখায়। আসুন, সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও বৈষম্যমূলক চিন্তার অবসান ঘটিয়ে আমরা এমন এক পৃথিবী গড়ে তুলি, যেখানে প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে এবং প্রত্যেকে প্রত্যেকের নাগরিক ও মানবিক अधिकारের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে। তবেই মানবতা জয়ী হবে, সুপ্রতিষ্ঠিত হবে প্রকৃত সুশাসন।
লেখকঃ প্রফেসার ড. শেখ আসিফ এস. মিজান
উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ