পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলা সদর যেন দিন দিন ময়লার শহরে পরিণত হচ্ছে। নেই পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নেই ময়লা-আবর্জনা ফেলার নির্ধারিত স্থান। ফলে বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে যেখানে-সেখানে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে, বাজারের অলিগলিতে, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমনকি খালেও গড়ে উঠেছে ময়লার বিশাল স্তূপ। পচা আবর্জনার উৎকট দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি। অথচ দীর্ঘদিনের এ সমস্যা নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ।
উপজেলা সদরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, জনবহুল বাজার, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও আবাসিক এলাকার আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। কোথাও বাসাবাড়ির উচ্ছিষ্ট, কোথাও বাজারের পচনশীল বর্জ্য, আবার কোথাও পলিথিন, প্লাস্টিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ফেলে দেওয়া সামগ্রীর স্তূপ। নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণের ব্যবস্থা না থাকায় দিনের পর দিন এসব আবর্জনা জমে একেকটি স্থান পরিণত হয়েছে অঘোষিত ময়লার ভাগাড়ে। দুর্গন্ধের কারণে পথচারীদের নাক চেপে চলাচল করতে হচ্ছে।
সবচেয়ে দুর্ভোগপূর্ণ স্থানগুলোর একটি হচ্ছে উপজেলা সদরের নতুন বাজার এলাকার পূর্ব প্রান্ত। এখানে সড়কের পাশেই গড়ে উঠেছে বিশাল ময়লার স্তূপ। আশপাশের বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য প্রতিনিয়ত ফেলার কারণে জায়গাটি দুর্গন্ধময় হয়ে উঠেছে। এ পথে চলাচলকারী পথচারী, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
একই চিত্র পীরতলা বাজারের পুরোনো থানা পুলসংলগ্ন এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ফেলা ময়লা-আবর্জনায় সেখানে তৈরি হয়েছে বিশাল ভাগাড়। পচনশীল বর্জ্যের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের এলাকায়। দুমকি থানায় প্রবেশের সংযোগ সড়কের পাশেও নির্বিচারে ময়লা ফেলার কারণে জমেছে আবর্জনার স্তূপ। গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থানে বর্জ্যের এমন অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা।
এ ছাড়া সৃজনী বিদ্যানিকেতন ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় বাজারের বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ফেলে তৈরি করা হয়েছে একাধিক ময়লার স্তূপ। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উচ্ছিষ্ট ও পচনশীল আবর্জনায় এলাকাটির পরিবেশ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন এ পথ দিয়ে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দুর্গন্ধের মধ্যে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
বর্জ্য অব্যবস্থাপনার ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্র দিয়ে বয়ে যাওয়া পীরতলা খালেও। লুথ্যারান হেলথ কেয়ার হাসপাতাল এলাকা থেকে আঙ্গারিয়া পর্যন্ত খালের বিভিন্ন অংশে জমেছে বিপুল পরিমাণ ময়লা-আবর্জনা। বিশেষ করে পীরতলা বাজার ও আশপাশের হাটবাজারের বর্জ্য নির্বিচারে খালে ফেলার কারণে খালটির পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আগে থেকেই বিভিন্ন স্থানে দখল ও ভরাটের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়া খালটি এখন ময়লা-আবর্জনার চাপে আরও বিপর্যস্ত। এভাবে চলতে থাকলে একসময় খালটির অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলা সদরে বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও অপসারণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। নেই পর্যাপ্ত ডাস্টবিন কিংবা নির্ধারিত বর্জ্য ফেলার স্থান। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে বাড়ি বা দোকানের আশপাশের খালি জায়গা, সড়কের পাশ কিংবা খালে ময়লা ফেলছেন। তবে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকার পাশাপাশি জনসচেতনতার অভাবকেও এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন সচেতন বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, প্রত্যেকটা বাসায় প্রতিদিন কিছু না কিছু ময়লা তৈরি হয়, অথচ এগুলো ফেলার নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। তাই মানুষ বাধ্য হয়ে রাতের আড়ালে অথবা কেউ কেউ দিনের বেলায়ই যাবতীয় ময়লা যেখানে সেখানে ফেলে যান। বিশেষ করে খালেই সবাই এই ময়লাগুলো নিক্ষেপ করেন।
পীরতলা বাজারের ব্যবসায়ী শাহীন মৃধা বলেন, প্রতিনিয়ত মানুষ সব ময়লা আবর্জনা খালে ফেলছেন, যাদের বাসা থেকে খাল কিছুটা দুরত্বে আছে তারা বাসার গলিতেই খোলা জায়গায় সকল ময়লা আবর্জনা ফেলছেন। একজনকে দেখে আরেকজন, এভাবে পুরো গলির বাসিন্দারা সেই স্থানটাকে ময়লার ভাগাড়ে পরিনত করছেন।এই এলাকায় এখন প্রতিটি এলাকা মোটামুটি দুর্গন্ধে পরিপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সিয়াম বলেন, ময়লা যেখানে সেখানে শুধু দু-একজন ফেলে না, এই এলাকার সবাই ফেলে কারন এখানে ডাস্টবিন নেই। পুরো এলাকার সবাই নিরুপায় হয়েই যত্রতত্র ময়লা ফেলে পরিবেশ দূষিত করছেন।
এদিকে যত্রতত্র জমে থাকা পচনশীল বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্মুক্ত স্থানে আবর্জনার স্তূপ মশা-মাছির বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি বৃষ্টির পানির সঙ্গে বর্জ্য আশপাশের নালা ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়লে পানিদূষণ এবং বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের অব্যবস্থাপনা দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মীর শহীদুল হাসান বলেন, আমাদের মেডিকেল বর্জ্য ফেলার জন্য উপজেলা প্রশাসন থেকে একটা ময়লা ডাম্পিং স্টেশন তৈরি করে দিয়েছিলো কিন্তু সেটি যথাযথ কাজে আসছে না। এই মেডিকেল বর্জ্যের কারনেও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। দুমকি যদি পৌরসভা হতো তাহলে হয়তো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হতো। যত্রতত্র এভাবে ময়লা আবর্জনার স্তুপ হওয়ায় সাধারণ মানুষ ক্রমেই স্বাস্থ্য ঝুকিতে পড়ছেন। দুমকিতে অবশ্যই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুত্ব আরোপ করার সময় এসেছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপজেলা সদরে দ্রুত পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ডাস্টবিন স্থাপন, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ, নির্ধারিত বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র স্থাপন এবং যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজার ও আবাসিক এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে দুমকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এসব বর্জ্য মাঝেমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বে বিভিন্ন জায়গা থেকে পরিষ্কার করা হয়। স্থায়ী কোনো ময়লার ডাম্পিং স্টেশন বেশ ব্যয়বহুল কাজ। পূর্বে এসব ময়লা আবর্জনা অপসারণে কোনো সুদুরপ্রসারি উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ভবিষ্যতে আমরা এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবো।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি উপজেলা সদরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার ও জনবসতিপূর্ণ এলাকা এভাবে আর কতদিন ময়লার ভাগাড় হয়ে থাকবে? প্রতিদিন বাড়ছে আবর্জনার স্তূপ, ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। অথচ বর্জ্য অপসারণে নেই কার্যকর ব্যবস্থা। এ অবস্থায় দুমকি সদরকে ময়লার অভিশাপ থেকে মুক্ত করে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন এলাকাবাসী।