Header
প্রিন্ট তারিখঃ অক্টোবর ১১, ২০২৬ , ৩:৩৩ অপরাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ অক্টোবর ১১, ২০২৬ , ১২:৫৬ অপরাহ্ণ

লিগ্যাল এইডের মধ্যস্থতায় বিরোধ নিষ্পত্তিতে টপ রেকর্ডে ময়মনসিংহ লিগ্যাল এইড অফিস

লেখকঃ মোঃ আমিনূর ইসলাম রাব্বি, ময়মনসিংহ ব্যুরো

দীর্ঘদিনের জমিজমার বিরোধ মিটছে এক বৈঠকেই। আবার কোথাও আদায় হচ্ছে আটকে থাকা দেনমোহর কিংবা পাওনা টাকা। আদালতের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় না গিয়েও আলোচনার মাধ্যমে এমন অসংখ্য বিরোধের সমাধান হচ্ছে ময়মনসিংহ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে। বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) কার্যক্রমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সহজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে ৬ হাজার ৪৩৯টি বিরোধ নিষ্পত্তি করে দেশের জেলাগুলোর মধ্যে প্রথম অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ। এ সময়ে বিরোধ মীমাংসার মাধ্যমে আদায় হয়েছে প্রায় পৌনে ১২ কোটি টাকা। আইনি পরামর্শ পেয়েছেন ৮ হাজার ৭২৬ জন এবং বিভিন্নভাবে উপকৃত হয়েছেন ৯ হাজার ২৫২ জন। বিরোধ নিষ্পত্তির পরিসংখ্যানে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কুমিল্লা এবং তৃতীয় অবস্থানে নোয়াখালী।

জেলা লিগ্যাল এইড অফিস সূত্রে জানা গেছে, দেনমোহর, বিবাহবিচ্ছেদ, দাম্পত্য কলহ, যৌতুক, পারিবারিক বিরোধ, চেক ডিজঅনার, আর্থিক পাওনা ও জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ সেবা নিতে আসছেন। উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে এসব বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অসচ্ছল ও অসহায় বিচারপ্রার্থীদের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। গত এক বছরে ৭০৪টি মামলায় বিনা খরচে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুই সন্তান থাকা সত্ত্বেও এক নারীকে তালাক দেন তাঁর স্বামী। পরে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে মাত্র এক মাসের মধ্যে তাঁদের আবার সংসারজীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। অন্যদিকে, পাঁচ সৎ ভাইবোনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা জমিজমার বিরোধও মাত্র এক দিনের বৈঠকে বিনা খরচে নিষ্পত্তি হয়েছে।

আরেক ঘটনায় মৌখিক চুক্তির ভিত্তিতে জমি কেনাবেচার লেনদেন সম্পন্ন হলেও জমির মালিক দলিল নিবন্ধন করে দিচ্ছিলেন না। পরে লিগ্যাল এইড কর্মকর্তার মধ্যস্থতায় দুই মাসের মধ্যে ওই বিরোধের সমাধান হয়। একইভাবে বিবাহবিচ্ছেদের পর আটকে থাকা ছয় লাখ টাকা দেনমোহর পরিশোধের বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে। জমির দখলসংক্রান্ত বিরোধ নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের নজিরও রয়েছে।

ময়মনসিংহ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের তিন বছরের তুলনামূলক কার্যক্রমের বিবরণীতে দেখা যায়, ২০২৩ সালে মোট ৭০২টি এবং ২০২৪ সালে ৯০০টি বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছিল। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫৭৯টিতে। একই সময়ে সফল বিরোধ মীমাংসার সংখ্যা ২০২৩ সালের ১৪৩টি এবং ২০২৪ সালের ১৪২টি থেকে বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ২৪৯টি।

আইনি পরামর্শ গ্রহণকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৩ সালে ১ হাজার ১৮৯ জন এবং ২০২৪ সালে ১ হাজার ২৩৮ জন আইনি পরামর্শ নিয়েছিলেন। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ১৩৮ জনে। একইভাবে উপকারভোগীর সংখ্যা ২০২৩ সালের ৩৬২ জন এবং ২০২৪ সালের ৫৫৭ জন থেকে বেড়ে হয়েছে ৯ হাজার ৭০৯ জন।

বিরোধ মীমাংসার মাধ্যমে অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৩ সালে আদায় হয়েছিল ২ কোটি ৯৪ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা এবং ২০২৪ সালে ৯১ লাখ ৫২ হাজার টাকা। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকায়।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত সফল বিরোধ মীমাংসা প্রায় ১ হাজার ৪৮৪ শতাংশ, মোট বিরোধ নিষ্পত্তি প্রায় ৬৩১ শতাংশ এবং আইনি পরামর্শ গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৪৭৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৬৪৩ শতাংশ এবং মীমাংসার মাধ্যমে অর্থ আদায়ের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতিতে আদালতের বাইরে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের সমাধান হওয়ায় বিচারপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমছে। বিশেষ করে পারিবারিক বিরোধের ক্ষেত্রে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হওয়ায় অনেক পরিবার ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের জমিজমা ও আর্থিক বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

ময়মনসিংহ জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম দৈনিক আজকালের কন্ঠের প্রতিবেদককে বলেন, ‘গত এক বছরে আমাদের মধ্যস্থতায় বিপুলসংখ্যক বিরোধের সফল মীমাংসা হয়েছে। সমঝোতার মাধ্যমে মামলার পক্ষগুলোর পাওনা টাকা আদায় করে দেওয়া হয়েছে। শত কোটি টাকা মূল্যের জমিজমা উদ্ধার এবং শতাধিক সংসারকে বিচ্ছেদের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।

তিনি আরও জানান, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বিচারপ্রার্থীদের বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের ফলে লিগ্যাল এইড অফিসে সেবাগ্রহীতা ও উপকারভোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

প্রিন্ট করুন