নওগাঁর রাণীনগরে একটি পুকুরের মাছ লুটের পর এবার সেই পুরো পুকুরটি দখলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। মাছ লুটের ঘটনায় প্রতিপক্ষরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ অসিথ দেবনাথ নামের এক সংখ্যা লঘু পরিবারের। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ভুক্তভোগী ওই পরিবারটি।
তাদের দখলের চেষ্টার কারণ ও সমাধানের পথ খুঁজতে রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ পুলিশের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
গত আগষ্ট মাসে উপজেলার করজগ্রাম-দোগাছি এলাকায় অসিত দেবনাথদের ১০বিঘার সম্পত্তিসহ একটি পুকুর হঠাৎ করে দখলের চেষ্টা ও পুকুর থেকে মাছ লুটের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ২৯ আগস্ট অসিত দেবনাথ বাদি হয়ে ৭জনকে এজাহারনামীয় আসামি করে রাণীনগর থানায় মামলা দায়ের করেন।
মামলার প্রেক্ষিতে করজগ্রাম দোগাছি উদনাপাড়া গ্রামের আব্দুল জব্বারের ছেলে সবুজ (৩৫), মৃত সাঈদ আলীর ছেলে আব্দুল সাত্তার (৪৬), মৃত মফিজ উদ্দীনের ছেলে বুলু (৪৫) ও জহরুল ইসলাম (৪৩) কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ভুক্তভোগী অসিথ দেবনাথ করজগ্রাম হিন্দু পাড়ার মৃত অরুণ চন্দ্র দেবনাথের ছেলে।ভুক্তভোগী পরিবারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, করজগ্রাম দোগাছি এলাকায় অসিত দেবনাথদের পৈত্রিক ও ক্রয়কৃত প্রায় ১০বিঘা জমির একটি পুকুর রয়েছে। ওই জায়গার মধ্যে ১০ শতক জমি পাবে বলে দাবি করেন একই এলাকার জব্বারের দুই ছেলে সবুজ ও শরিফুল, জব্বারের আরও তিন ভাই বুলু, জহুরুল এবং ফুলবর। সেই সাথে ছাত্তার নামে তৃতীয় এক ব্যক্তি তাদেরকে উসকে দিয়ে আরও অশান্তি সৃষ্টি করছে। যেই কারণে দিনের পর দিন এমনকি মাসের পর মাস উত্তেজনা ও আতঙ্কে দিন পর করতে হচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারটিকে।
ভুক্তভোগী অসিত দেবনাথ বলেন, আমাদের ওখানে পৈত্রিক সম্পত্তি আছে, যা ১৯৮২ সাল থেকে ভোগ দখলে রয়েছি। পরে সেখানে আরও কিছু সম্পত্তি কেনা হয়। এরমধ্যে জব্বার গংদের দুই বোন মর্জিনা ও মনোয়ারার কাছ থেকে ২০০১ সালে ২৪শতক জমি কবলা দলিল করে নিই। তাও চেয়ারম্যানের মাধ্যমে লিখিত আপোষ মিমাংসার পরের দিন। এরপর থেকে শান্তি পূর্ণ ভাবে পুকুরে মাছ চাষ করে খাচ্ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে গত আগষ্ট মাসে তারা আমাদের পুকুর থেকে জোর করে দেড় লাখ টাকার মাছ মেরে নিয়ে যায়। এতে আমরা হতভম্ব হয়ে পড়ি। বাধ্য হয়ে থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। এরপর জামিনে এসে এখন পুরো পুকুর দখলের চেষ্টা করছে। আমার জানা নেই, তারা কি মুলে কোন উদ্দেশ্য এসব করছে। থানা পুলিশ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানার চেষ্টা করছি।
অসিথ দেবনাথ আরও বলেন, আমার ওই সম্পত্তির মধ্যে ১০ শতক জায়গা প্রতিপক্ষদের আছে বলে দাবি করে জব্বার গং’রা। অথচ তারা কোনো কাগজ দেখাতে পারেনা। বসতে চাইলে বসেনা। শুধু শুধু আমাদের হুমকির ওপর রেখেছে। আজ কয়েক মাস থেকে আমরা সেখানে যেতে পারছিনা। যেতে চাইলে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি পুকুরে মাছের জন্য খাবার দিতে যেতে পারছিনা। আমি সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানাচ্ছি।
স্থানীয় অতুল দেবনাথ, অখিল চন্দ্র দেবনাথ ও রবিন দেবনাথসহ কয়েকজন বলেন, আমাদের বয়স ৫০ বছরের বেশি হবে। আমরা জানি ওখানে অসিথের বাবার পৈত্রিক জমিসহ একটি পুকুর আছে। তার পাশেই আরেকটি পুকুরসহ কিছু জমি কিনে তার বাবা। পরে দুই পুকুরের পাড় তুলে দিয়ে একটি পুকুর করে। প্রায় ২৫ বছর থেকে দেখছি পুকুরটি অসিথরা ভোগ দখল করে আছে। কিন্তু হঠাৎ করে শুনতেছি পুকুরের জমি নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে। এর বেশি কিছু আমাদের জানা নেই।
জানার জন্য জব্বার এবং তার দুই ছেলে সবুজ ও শরিফুল কারো সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে শরিফুলের মোবাইলে পরপর তিন দিন ফোন দিয়েও তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
জানতে চাইলে অভিযোগ ওঠা আব্দুল সাত্তার বলেন, মারামারির দিন আমি বাড়িতে ছিলাম না। এবং অসিতের সঙ্গে আমার কোনো বিরোধও নেই। আমার বাড়ি পুকুর পাড়ে। কিন্তু “আমি পুকুর বা জমির বিরোধের সঙ্গে জড়িত নই। জব্বার গংরা আমার রক্তের কেউ নয়। তারপরও আমাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে।” আর মামলায় জড়ানোর কারণে আমি তাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি।
চেয়ারম্যানের মাধ্যমে লিখিতভাবে পুকুরের ওই জমি বোনদের দিয়ে মিমাংসা হয়েছিল স্বীকার করে সাত্তার আরও বলেন, কাগজ পত্রের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এই সম্পত্তির মালিক শুধু বোনেরা হতো, যদি বোনেরা দাগে দাগে বিক্রি না করতো। যেহেতু বোনেরা দাগে বিক্রি করছে সেই কারণে ভাইয়েরা পুকুরের ওই জায়গায় দখলে যাচ্ছে। তবে ৪বিঘা জলার পুকুরের মধ্যে জব্বার গং’রা শুধু ১০শতকের অংশীদার। আর সবগুলো অসিথের অংশ। পুরো চার বিঘার পুকুর তারা দখল নিতে পারেনা। সেই জন্য অসিথের অংশ আলাদা করে মাছ ছাড়া হয়েছিল। এরপর সেই পুকুরের মাছ তোলার পরে অসিথ বাদী হয়ে মামলা করে।
হুমকির বিষয়ে তিনি বলেন, বরং অসিথই আমাকে হুমকি দিয়েছে। অথচ আমরা এখন পর্যন্ত কোনো খারাপ ব্যাবহারও করিনি, কোনো কিছু কই নি। দেখা যাক অসিথ কত দূর পর্যন্ত কি করে। এখন যদি তারা বসে সমধান নিতে চায় তাহলে প্রথমে অসিথকে মামলা তুলতে হবে। তারপর বসার একটা পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
জানতে চাইলে কালিগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান বলেন, প্রায় দুই যুগ আগে তাদের ভাই-বোনদের মধ্যে একটা লিখিত ভাগ ভাটোয়ারার আপোস করে দেওয়া হয়। এরপর দুই বোনের কাছ থেকে অসিথ জমি কিনে নেয়। প্রথম কবলামূলে অসিথ ওই জমির মালিক। তারপরও আমি মনে করি উভয়পক্ষের বসে একটা সমাধার করা উচিৎ। কারণ জবরদখল ও মারপিট কাম্য নয়।
জানতে চাইলে রাণীনগর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোসারব হোসেন বলেন, প্রত্যেকের আইনগত বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। অসিথ দেবনাথ হিন্দু হয়েছে জন্য বিচার পাবেনা এরকম হতে পারেনা। অসিথ দেবনাথকে অবশ্যই আইনগতভাবে সহযোগিতা করা হবে। আর হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের আলাদা সহানুভুতি ও দূর্বলতা আছে। কাজেই অসিথ দেবনাথের পরিবার ও তার প্রতিপক্ষদের উভয়কেই আইনগতভাবে সহযোগিতা করে সমাধান করা হবে।
জানতে চাইলে থানার অফিসার ইনচার্জ জাকারিয়া মন্ডল বলেন, ঘটনা জানার পর সেখানে যাতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি না হয়ে সেই জন্য পুলিশ গিয়েছিল। এবং অসিথের মামলার প্রেক্ষিতে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে উভয়পক্ষকে বসে শান্তিপূর্ণভাবে মিমাংসার জন্য বলা হয়েছিল। তারপরও অভিযোগ পেলে প্রয়োনীয়র ব্যবস্থা নেওয়া হবে।