ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বড় বায়সা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পুকুর ইজারায় নিয়ম না মানা, আয়-ব্যয়ের হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করে তসরুপ, মুভমেন্ট রেজিস্টার না থাকা, অনলাইন এবং শ্রেণী ভিত্তিক রেজিস্টার খাতায় শিক্ষার্থীর সংখ্যার অমিল, একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীকে একই কক্ষে পাঠদান এবং নিয়মিত পাঠদান ও শ্রেণি পর্যবেক্ষণ না করা,স্লিপ এর অর্থ ভুয়া বিল ভাউচারে উত্তোলন, ভারতীয় সনদ ব্যবহার করে চাকরিতে যোগদানের অভিযোগ উঠেছে খোদ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের প্রমাণাদি ইতিমধ্যে প্রতিবেদকের হাতে এসে পৌঁছেছে।
বিদ্যালয়টিতে প্রকৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট ৪৪ জন হলেও মাসিক রিটার্নে দেখানো হয়েছে ৫৯ জন। মূলত কাগজে-কলমে ভুয়া ১৫ জন শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে বিদ্যালয়ে তাদের কোন অস্তিত্ব নেই। অর্থাৎ প্রায় ৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন করে সর্বমোট ৫ জন শিক্ষক রয়েছেন বিদ্যালয়টিতে।
জানা যায়, বিদ্যালয়টির প্রাক শ্রেণীতে ৮ জন থাকলেও রিটার্নে দেখানো হয়েছে ১৪ জন। প্রথম শ্রেণীতে ১৩ জন রিটার্নে এবং বাস্তবেও আছে ১৩ জন, দ্বিতীয় শ্রেণীতে ৫ জন থাকলেও রিটার্নে ৭ জন দেখানো হয়েছে । তৃতীয় শ্রেণীতে রিটার্নে ১০ জন বাস্তবে আছে ৮ জন, চতুর্থ শ্রেণীতে রিটার্নের ৯ জন দেখানো হলেও আছে ৭ জন, সর্বশেষ পঞ্চম শ্রেণীতে রির্টানে উল্লেখ আছে ৬ জন কিন্তু বাস্তবে মাত্র ৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রাক থেকে ইয়ামিন এবং প্রথম শ্রেণী থেকে ইয়াসিন ও রমজান নামের দুইজন শিক্ষার্থী এ বিদ্যালয় থেকে মাদ্রাসায় গিয়ে ভর্তি হলেও সরকারি বিদ্যালয়ের উপবৃত্তি থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়নি আজও। সরকারি বিধিকে উপেক্ষা করে শিক্ষার্থী কম থাকলেও বেশি দেখিয়ে এবং নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিদ্যালয়টি প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদ পরিচালনা করে আসলেও দায়িত্বরত উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন।
বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পিয়ার মোহাম্মদ ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯০ সালে যোগদান করেন। চাকরিতে যোগদানের সময় তিনি পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাশের সনদ ব্যবহার করেছেন বলে জানা যায়। পশ্চিমবাংলার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৯৮৮ সালে আলিম এবং ১৯৯০ সালে ফাজিল পরীক্ষার সনদের কপি জমা দিয়েছিলেন তিনি । বাংলাদেশের সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তার ব্যবহারিত ভারতীয় সনদের সত্যতা এবং তা যথাযথ নিয়ম অনুসারে এবং বৈধভাবে ব্যবহার করা হয়েছে কিনা তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী যেকোনো বিদেশি ডিগ্রিধারী চাকরি প্রার্থী যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ (ইউজিসি বা শিক্ষা বোর্ড) থেকে সমতা সনদ বা ‘ইকুইভ্যালেন্সি সার্টিফিকেট’ জমা দিতে পারেন, তবে তিনি সরকারি চাকরির জন্য সম্পূর্ণ যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। এক্ষেত্রে পিয়ার মোহাম্মদ সমতা সনদ জমা দিয়েছেন কিনা তাও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায় , ২০২৪ সালের পুকুর ইজারা বাবদ পাওয়া অর্থের যথাযথ হিসাব না থাকা এবং একইভাবে ২০২৬ সালে পুকুর ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রেও যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করে পছন্দের ব্যক্তিকে ইজারা দাওয়া হয়। ইজারা দেওয়ার পর বিষয়টি বৈধতা দেওয়ার জন্য পরবর্তী সময়ে ব্যাকডেটে রেজুলেশন তৈরি করে অর্থ ব্যাংকে জমা রাখা হয়েছিল। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট রেজুলেশন, ব্যাংক হিসাব, ইজারা-সংক্রান্ত কাগজপত্র ও অর্থ জমার সময় যাচাই করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
বিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫-‘২৬ অর্থ বছরে স্লিপের টাকা খরচ দেখিয়ে বিভিন্ন ভুয়া বিল ভাউচারে প্রধান শিক্ষক নিজের হাতে লিখে টাকা উত্তোলন করেছেন। ওইসব বিল ভাউচার পর্যালোচনা করে দেখা যায় কালীগঞ্জে অবস্থিত তুষার ইলেকট্রিক থেকে পেপার এবং প্রিন্টার মেশিনের টোনার কেনা হয়েছে। অথচ ওই দোকানে এধরনের মালামাল বিক্রি হয় না। সম্প্রতি বিদ্যালয়ে একজন মেয়ে শিক্ষার্থীকে জড়িয়ে সহকারী শিক্ষক শাহ আলমকে কর্মরত অবস্থায় পেটানোর ঘটনায় তিনি সাময়িক বরখাস্ত হন এবং ওই পরিবারের লোক তার নামে থানায় মামলা করেন। উক্ত ঘটনায় শাহ আলম নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং জামিনে মুক্ত হয়ে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আদালতে দ্রুত সি আর ৫২ / ২০২৬ এ একটি মামলা দায়ের করেন। সিরিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দ্রুত বিচার আদালত ঝিনাইদহ উক্ত মামলাটি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে তদন্তপূর্বক ১৪ ডিসেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ প্রদান করেন।
বিদ্যালয়ের নানা অনিয়ম এবং চাকরিতে যোগদানে ভারতীয় সনদ ব্যবহারের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখতে অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থী বেশি দেখানো হয়েছে। স্লিপের টাকা নিয়ম মেনে খরচ করা হয়েছে। পুকুর ইজারা দেওয়া এবং সেখান থেকে আয় হওয়া অর্থ ব্যয়ে কোন অনিয়ম করা হয়নি। বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে আমার শিক্ষাগত যোগ্যতার ভারতীয় সনদ যথাযথ নিয়ম মেনেই ব্যবহার করা হয়েছে। ইতিপূর্বে তা কর্তৃপক্ষ একাধিকবার যাচাই-বাছাই করলেও কোন ত্রুটি পায়নি। সহকারী শিক্ষক শাহ আলম ও একজন শিক্ষার্থীকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রেক্ষিতেই শাহ আলম কোর্টে মামলা করেছেন, যে বিষয়টি ইতিমধ্যে আমি জেনেছি। আশা করছি কয়েক দিনের মধ্যে ওই বিষয়েও সুষ্ঠু মীমাংসা হয়ে যাবে।
কালীগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রোকনুজ্জামানের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বড় বায়সা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ে যেসব অভিযোগের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হবে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা, রিটার্ন, পুকুর ইজারা, আয়-ব্যয়ের হিসাব, স্লিপের অর্থ ব্যয় এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয় সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে দেখা হবে। কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্তের বিষয়টিও যথাযথভাবে সম্পন্ন করা হবে।”
ঝিনাইদহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন বলেন, “সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংক্রান্ত তথ্য, আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে নিয়ম মেনে চলা বাধ্যতামূলক।
বড় বায়সা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলো যাচাই করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া প্রধান শিক্ষকের শিক্ষাগত সনদ ও চাকরিতে যোগদানের সময় ব্যবহৃত কাগজপত্র নিয়েও যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে প্রকৃত বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।”