Header
প্রিন্ট তারিখঃ অক্টোবর ৪, ২০২৬ , ৩:২০ অপরাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ অক্টোবর ৪, ২০২৬ , ১২:৫৭ অপরাহ্ণ

ঘোড়াঘাটে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের পাতা খেলা

লেখকঃ সাকিব হাসান নাইম ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:

একসময় মাঠের চারপাশে মানুষের ভিড়, ঢোলের বাদ্য আর প্রতিযোগীদের উত্তেজনায় মুখর হয়ে উঠত গ্রাম। পাতা খেলা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসতেন নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষ। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে গ্রামবাংলার লোকজ বিনোদনের এমনই এক ঐতিহ্যবাহী আয়োজন ছিল ‘পাতা খেলা’। তবে কালের বিবর্তনে আধুনিক বিনোদন, প্রযুক্তির প্রসার ও নিয়মিত আয়োজনের অভাবে ঐতিহ্যবাহী এই খেলাটি এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আগের মতো নিয়মিত পাতা খেলার আয়োজন নেই। তবে স্থানীয় যুবসমাজ কিংবা কোনো কোনো আয়োজকের উদ্যোগে খেলার আয়োজন করা হলে এখনও ব্যাপক দর্শকের সমাগম ঘটে। এতে বোঝা যায়, মানুষের আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি; বরং নিয়মিত আয়োজন ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবেই খেলাটি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাচ্ছে।

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত পাতা খেলার আয়োজনের ধরনও বেশ বৈচিত্র্যময়। খেলার মাঠের মাঝখানে কলাগাছ রেখে বিশেষ লোকাচার ও মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে প্রতিযোগীদের পাতা নিজেদের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ আয়োজনের সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতি ও লোকাচারেরও যোগ রয়েছে।

স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় গ্রামীণ জনপদে বিনোদনের সুযোগ ছিল সীমিত। ফলে পাতা খেলাসহ বিভিন্ন দেশীয় খেলা ছিল মানুষের আনন্দের অন্যতম মাধ্যম। কোনো এলাকায় পাতা খেলার আয়োজন হলে আশপাশের কয়েকটি গ্রাম থেকে মানুষ দলবেঁধে সেখানে আসতেন। খেলাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হতো উৎসবমুখর পরিবেশ এবং মানুষের মধ্যে বাড়ত সামাজিক যোগাযোগ।

উপজেলার বেলওয়া গ্রামের প্রবীণ পাতা খেলোয়াড় রউফ মেম্বার পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমাদের সময়ে পাতা খেলা হলে অন্যরকম ধুম পড়ে যেত। গ্রামে গ্রামে মাইক দিয়ে কয়েক দিন ধরে প্রচার করা হতো। পাতা খেলাকে কেন্দ্র করে বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনের আনাগোনা শুরু হতো। সেই দিন আর নেই।”

সিংড়া গ্রামের তরুণ প্রজন্মের পাতা খেলোয়াড় সাকিব হাসান নাইম বলেন, “বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে শুনেছি, আগের সময়ে পাতা খেলা মানেই ছিল ঈদের মতো আনন্দের আমেজ। এখন কোনো কোনো গ্রামে হঠাৎ করে আয়োজন হয়, কিন্তু আগের মতো নিয়মিত আয়োজন দেখা যায় না।”

বর্তমানে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন গেম শিশু-কিশোরদের অবসর সময়ের বড় একটি অংশ দখল করে নিয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ খেলার মাঠ কমে যাওয়া, নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যবাহী খেলার নিয়ম শেখানোর উদ্যোগের অভাব এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতা না থাকায় পাতা খেলার চর্চাও কমে গেছে।

স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “এটি শুধু একটি খেলা নয়, আমাদের গ্রামের পুরোনো সংস্কৃতির অংশ। আমরা ছোটবেলায় যে খেলা দেখেছি, নতুন প্রজন্ম তার অনেক কিছুই জানে না। এখনই উদ্যোগ না নিলে একসময় পাতা খেলার কথা শুধু গল্পেই বলতে হবে।”

স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের মতে, ঘোড়াঘাটের মতো ঐতিহাসিক জনপদে লোকজ সংস্কৃতির এসব উপাদান সংরক্ষণ করা জরুরি। শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে নয়, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ক্রীড়া সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। স্থানীয় মেলা, উৎসব, জাতীয় দিবস ও বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পাতা খেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

বিদ্যালয় ও গ্রামভিত্তিক সাংস্কৃতিক আয়োজনে দেশীয় খেলাগুলোর পরিচিতি তুলে ধরার পাশাপাশি এসব খেলার নিয়ম, ইতিহাস ও স্থানীয় বৈশিষ্ট্য লিখিত এবং ভিডিও আকারে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে ঘোড়াঘাট উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা খলিলুর রহমান বলেন, “পাতা খেলাসহ আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যের দেশীয় খেলাগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এসব খেলা নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তুলতে স্থানীয় মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন দিবসের আয়োজনে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করব। স্থানীয় সংগঠন ও তরুণদের উদ্যোগ থাকলে যুব উন্নয়ন ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সহযোগিতা করা সহজ হবে।”

ঘোড়াঘাটের মানুষের প্রত্যাশা, স্থানীয় উদ্যোগ ও প্রশাসনিক সহযোগিতায় নিয়মিত পাতা খেলার আয়োজন আবারও শুরু হবে। মাঠে ফিরবে শিশু-কিশোররা, একসঙ্গে জড়ো হবে গ্রামের মানুষ। আর এর মধ্য দিয়ে শুধু একটি খেলা নয়—গ্রামবাংলার স্মৃতি, লোকজ সংস্কৃতি ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্যও সংরক্ষিত হবে।

আজকালের কন্ঠ/আর এস

প্রিন্ট করুন