Header
প্রিন্ট তারিখঃ অক্টোবর ৩, ২০২৬ , ৭:১৬ অপরাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ অক্টোবর ৩, ২০২৬ , ৫:১৬ অপরাহ্ণ

গৌরীপুরে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক, রাত নামলেই জমে আসর- প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ প্রকাশ

লেখকঃ মোঃ আমিনূর ইসলাম রাব্বি, ময়মনসিংহ ব্যুরো

ময়মনসিংহের গৌরীপুরে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হেরোইন, ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সহজলভ্য হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের টাকার মাদক কেনাবেচা হচ্ছে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ায় সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন অনেক অভিভাবক।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গৌরীপুরে বিভিন্ন রুটে মাদক প্রবেশ করছে। ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কসহ আশপাশের বিভিন্ন সড়ক ও রেলপথ ব্যবহার করে মাদক আনা হচ্ছে বলে দাবি তাদের। আখাউড়া হয়ে ভৈরবের পথে ট্রেনে গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক আসার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ঈশ্বরগঞ্জ, কেন্দুয়া, ত্রিশাল ও পূর্বধলার বিভিন্ন রুট ব্যবহার করেও মাদক ঢুকছে বলে স্থানীয়দের দাবি। মাদক পরিবহনে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নারী, ভিক্ষুক কিংবা বিভিন্ন ছদ্মবেশী ব্যক্তিকেও মাদক পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয় সূত্রের। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপজেলার বিভিন্ন নির্জন এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ে। মৎস্য খামারের পাহারাদারের ঘর, স্কুলের ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন ও লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা বিভিন্ন স্থাপনাও মাদক সেবনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গৌরীপুর পৌরসভার পশু হাসপাতাল, সরকারি হাসপাতালসংলগ্ন এলাকা, উপজেলা পরিষদের পেছনের অংশ, কোর্ট ভবন এলাকা, ডিগ্রি কলেজের আশপাশ ও রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় রাতের বেলায় মাদকসেবীদের আনাগোনা দেখা যায় বলে স্থানীয়দের দাবি। তাদের ভাষ্য, রাতে এসব এলাকায় নজরদারি কম থাকায় মাদকসেবীরা নির্জন স্থানগুলোকে বেছে নেয়।

মাদকের পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জুয়ার আসর বসার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অন্তত ১১টি স্থানে নিয়মিত জুয়া খেলা হয়। এর মধ্যে কলতাপাড়া এলাকায় কয়েকটি স্থানে নিয়মিত জুয়ার আসর বসে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিএনপি নেতা আল আমিন অভিযোগ করেন, এসব জুয়ার আসর থেকে ময়মনসিংহ (উত্তর) জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি তানভীর আহমেদের জন্য টাকা তোলা হয়। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে তানভীর আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, মাদক কেনাবেচার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি বিক্রেতার সঙ্গে দেখা না করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অগ্রিম টাকা নেওয়া হয়। পরে নির্দিষ্ট স্থানে ছদ্মবেশী বা মুখোশধারী ব্যক্তির মাধ্যমে মাদক পৌঁছে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের আরও দাবি, কিছু সচ্ছল পরিবারের সন্তানও মাদক কারবারে অর্থ বিনিয়োগ করছে। তাদের অর্থায়নে মাদক কিনে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

রামগোপালপুর এলাকাকে মাদক সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সন্ধ্যার পর মোটরসাইকেলে করে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে মাদক পৌঁছে দেওয়া হয় এবং গভীর রাত পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলে বলে দাবি তাদের।

এ ছাড়া আখাউড়া থেকে ট্রেনপথে গাঁজার চালান আসা এবং সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট হয়ে মদের চালান গৌরীপুরে প্রবেশের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মাদক সহজলভ্য হওয়ার কারণে কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। নেশার টাকা জোগাড় করতে চুরি, ছিনতাই, মারামারিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও বাড়ছে বলে দাবি তাঁদের।

চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণ করলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এর প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির ওপর নয়, পুরো পরিবার ও সমাজের ওপরও পড়ে।

সন্তান নিয়ে আতঙ্কে অভিভাবকরাও। মাদকাসক্ত সন্তানের কারণে অনেক পরিবারে অশান্তি তৈরি হচ্ছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, ছাত্রছাত্রী, যুবক-যুবতী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন।

গৌরীপুরের গোয়ারী গ্রামের দিনমজুর সোনা মিয়া জানান, তাঁর ২২ বছর বয়সী একমাত্র ছেলে রাসেল মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। নেশার টাকা না পেলে তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন এবং ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করতেন। একপর্যায়ে নেশার টাকা জোগাড় করতে ঘরের টিনের চালা বিক্রি করার পাশাপাশি চুরিতেও জড়িয়ে পড়েন বলে জানান সোনা মিয়া। পরে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় রাসেলকে একটি রিহ্যাব সেন্টারে ভর্তি করা হয়েছে।

প্রশাসনের কঠোর নজরদারির দাবি স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের। সচেতন মহল ও স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় গৌরীপুরে মাদকের বিস্তার দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় বিভিন্ন নির্জন এলাকায় মাদকসেবী ও কারবারিদের আনাগোনা বন্ধে নিয়মিত নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

তাঁদের মতে, মাদকের বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে নিয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।

তাঁরা আরও বলেন, মাদকের ভয়াবহতা থেকে কিশোর ও তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। সমন্বিতভাবে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি যুবসমাজকে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, গৌরীপুর সার্কেল দেবাশীষ কর্মকার বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের বিভিন্ন ধরনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে । তাছাড়া তিনি আরো বলেন স্থানীয়দের ভাস্য মতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি বর্তমানে তুলনামূলকভাবে একটু কম থাকলেও এখন থেকে নিয়মিত টহল ও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারিতে থাকবে গৌরীপুর পুলিশ প্রশাসন।

আজকালের কন্ঠ/আর বি

প্রিন্ট করুন