প্রতিদিন ক্যাম্পাস থেকে শহর ও শহর থেকে ক্যাম্পাসের পথে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইবি শিক্ষার্থী কর্মকর্তা, কর্মচারী নিয়ে ছুটে চলে যে বাসগুলো, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে বিভিন্ন নামে। যাতে যাত্রীদের নির্দিষ্ট গন্তব্য নির্বাচনে দোটানায় পড়তে না হয়। এদের কারো নাম দেওয়া হয়েছে মুক্ত বাংলা, কোনটির আবাহন বা বিজয় ৭১, স্পন্দন, স্বাধীনতা, স্পর্শক ইত্যাদি। এছাড়াও বেশ কিছু নদীর নামে নাম করা হয়েছে কিছু বাসের।
তবে তাদের গায়ে লেখা সে নামের দিকে ক’জন শিক্ষার্থীই বা ফিরে তাকান? কারও কাছে এ নাম গুলো নিছক একটি রুটের পরিচিতি বা তাড়াহুড়োর ভিড়ে চোখ এড়িয়ে যাওয়া কয়েকটি অক্ষর মাত্র। অথচ একটু মন দিলেই বোঝা যায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বাস গুলো শুধুই যাতায়াতের বাহন নয়, এ যেন বাংলা সাহিত্যের এক চলমান স্মারক। এরই মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য যোগাযোগ, কুহেলিকা, আরণ্যক, ধরনী, বলাকা যা ইবির পরিবহন পুলের পাঁচটি বাসের নাম, অথচ প্রতিটি নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক-একটি কালজয়ী সৃষ্টির গল্প। যা দশকের পর দশক পেরিয়ে গেলেও চীর প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে সময়ের পাতায়। সে প্রাসঙ্গিকতা টেনেই আজকের বয়ান।
‘যোগাযোগ’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৯২৯ সালে রচিত মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস, যেখানে ধর্মবিশ্বাস, পারিবারিক অহংকার আর নারীর আত্মমর্যাদার দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে বিশ শতকের বাঙালি সমাজের প্রেক্ষাপটে। মানুষে মানুষে বোঝাপড়ার এই আখ্যান আজও মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত সংযোগ কেবল দূরত্ব ঘোচানোর নাম নয়, তা অন্তরের কাছাকাছি পৌঁছানোরও নাম।
‘কুহেলিকা’ কাজী নজরুল ইসলামের শেষ উপন্যাস। আক্ষরিক অর্থে কুয়াশা হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে রহস্য আর দ্রোহের ব্যঞ্জনা যা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলিম তরুণদের যূথবদ্ধ সংগ্রামের কাহিনি, যা বিদ্রোহী কবির অসাম্প্রদায়িক চেতনারই প্রতিচ্ছবি হয়ে আজও প্রাসঙ্গিক।
‘আরণ্যক’ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী রচনা, যেখানে সভ্যতার কোলাহল থেকে দূরে বিহারের গহীন অরণ্যে মানুষ আর প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্ক অনুপম গদ্যে ফুটে উঠেছে। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা ছাপিয়ে, কুষ্টিয়া শহরের পেড়িয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা এ ক্যাম্পাসের কাছে ফিরে যাওয়ার নীরব আহ্বানই যেন এই নামের অন্তর্নিহিত সুর।
‘বলাকা’ রবীন্দ্রনাথের ১৯১৬ সালের কাব্যগ্রন্থ, কাশ্মীরের ঝিলাম নদীর তীরে উড়ে যাওয়া এক ঝাঁক হাঁসের দৃশ্য দেখে যার জন্ম। গতিময়তা, চিরচঞ্চলতা আর সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই এই কাব্যের প্রাণ। প্রতিদিন ক্যাম্পাসমুখী পথে ছুটে চলা বাসের সঙ্গে যার মিল যেন আশ্চর্যরকম সংগত।
আর ‘ধরনী’ এই একটি শব্দেই ধরা পড়ে মাটির টান, শিকড়ের কথা। যে ভূমিতে দাঁড়িয়ে বাকি চারটি সৃষ্টি জন্ম নিয়েছে, সেই স্থিতধী পৃথিবীরই প্রতীক হয়ে থাকে এই নাম, বাকি চারের উচ্ছলতাকে যেন এক ধরনের ভারসাম্য দিয়ে বেঁধে রাখে।
সব মিলিয়ে এই পাঁচটি নাম কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়। প্রতিদিনের যাত্রাপথে তারা বহন করে চলে বাংলা সাহিত্যের এক জীবন্ত পরম্পরা। শিক্ষার্থীদের অজান্তে এসব বাহনের প্রতিটি আসনে বসেই তারা কিছুক্ষণের জন্য হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা বিভূতিভূষণের সেই নীরব উত্তরসূরি, যিনি গন্তব্যের পাশাপাশি বহন করে নিয়ে যান একটুকরো সাহিত্যচেতনাও।