নিউইয়র্কের আকাশে তখন সন্ধ্যার আলো ম্লান হয়ে আসছে, হাডসন নদীর জলে শেষ বিকেলের সোনালি আভা। অথচ সেই মুহূর্তে বাংলাদেশের কোটি মানুষের চোখ নিবদ্ধ ছিল একটি মাত্র জায়গায় – জাতিসংঘের সেই ঐতিহাসিক সভাকক্ষের দিকে, যেখানে বিশ্বের ১৯৩টি দেশের পতাকার মাঝে জ্বলজ্বল করছে আমাদের প্রাণের লাল-সবুজ। সেই বিশ্বমঞ্চে যখন শহীদ জিয়ার রক্ত আর লক্ষ শহীদের স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে সম্পূর্ণ মাতৃভাষা বাংলায় ভাষণ দিতে উঠে দাঁড়ালেন প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমান, তখন কোটি বাঙালির বুক গর্বে, আনন্দে, আবেগে ভরে উঠলো। এটি শুধু একটি ভাষণ ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির হারানো আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের বজ্রকঠিন ঘোষণা, দীর্ঘ দেড় দশকের অন্ধকার পেরিয়ে আলোর পথে ফেরার বিজয়ধ্বনি। ২৪ সেপ্টেম্বর, ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া তাঁর প্রথম এই ভাষণে তিনি প্রমাণ করেছেন – ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা একটি জাতির আত্মপরিচয়। আর সেই আত্মপরিচয়ের প্রতীকের নামই দেশনায়ক তারেক রহমান।
ইতিহাসের বিরলতম বিশ্বরেকর্ড : বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। জাতিসংঘের ৮০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম একই পরিবারের তিন সদস্য – বাবা, মা ও সন্তান – রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিলেন। ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট এই একই মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, ১১তম বিশেষ অধিবেশনে তিনি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যহীন বিশ্বের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর ৪৮তম অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, যিনি ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত পাঁচবার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আজ ৪৫ বছর পর তাঁদেরই সুযোগ্য পুত্র সেই একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে পিতা-মাতার অসমাপ্ত স্বপ্নের কথা বিশ্বকে শোনালেন। এই বিশ্বরেকর্ড শুধু জিয়া পরিবারের নয়, এটি ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশের গৌরব।
শেকড়-সন্ধানী এক মহানায়কের স্মৃতিকাতরতা : ভাষণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী যখন বললেন, “জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে আজ আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর। এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই আমার পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া ভাষণ দিয়েছিলেন” – তখন বিশ্ববাসী দেখলো এক শেকড়-সন্ধানী রাষ্ট্রনায়ককে। ক্ষমতার দম্ভ নয়, পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা, শেকড়ের প্রতি টানই একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিকের পরিচয়। তিনি ইংরেজিতে ভাষণ দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি দিলেন বাংলায়। ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের রক্ত, তাঁর পিতার আদর্শকে সম্মান জানিয়ে তিনি প্রমাণ করলেন – “সবার আগে বাংলাদেশ”। বিশ্বনেতারা হেডফোনে অনুবাদ শুনেছেন, কিন্তু বাংলার ধ্বনি বিশ্বমঞ্চে গর্জে উঠেছে। এটি বাঙালি জাতিসত্তার বিজয়।
ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন বাংলাদেশের ঘোষণা : তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বীর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ ফ্যাসিবাদমুক্ত। গুম, খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট আর টাকা পাচারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ পুনরায় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। তিনি বিশ্বকে জানিয়ে দিলেন, বাংলাদেশ এখন নিরাপদ, স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব। “জনগণই আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস” – এই উচ্চারণ কোটি মানুষের হৃদয়ে আশার সঞ্চার করেছে। তিনি ১২ই ফেব্রুয়ারির সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির উপর জনগণের আস্থার কথা তুলে ধরে প্রমাণ করেছেন, তিনি প্রতিশোধের রাজনীতিতে নয়, প্রতিদানের রাজনীতিতে বিশ্বাসী।
যুদ্ধের পৃথিবীতে শান্তির বাংলাদেশের বার্তা : তারেক রহমানের ভাষণের কেন্দ্রীয় সুর ছিল শান্তি। পৃথিবীর নানা প্রান্তে যখন যুদ্ধ, সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক বিপর্যয় মানুষের জীবনকে বিপন্ন করছে, তখন তিনি অস্ত্রের ভাষার বিপরীতে বেছে নিয়েছেন সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভাষা। তিনি স্পষ্ট করেছেন – রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা, সম্মান ও মর্যাদা। তাঁর প্রত্যাশার বিশ্ব এমন একটি বিশ্ব, যেখানে মারণাস্ত্রের পরিবর্তে যুক্তি, আলোচনা, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা হবে পরিবর্তনের হাতিয়ার। তিনি পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ, নিরস্ত্রীকরণ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতিও বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এই বার্তা প্রমাণ করে, বাংলাদেশ যুদ্ধ চায় না, শান্তি চায়।
ফিলিস্তিন ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবতার নেতা : বিশ্ব যখন নীরব, যখন পরাশক্তিরা স্বার্থের হিসেবে ব্যস্ত, তখন দেশনায়ক তারেক রহমান ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী মানুষের পক্ষে বজ্রকণ্ঠে কথা বলেছেন – “আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারসহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ পুনরায় তার অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।” এই সাহসিকতা একমাত্র জিয়া পরিবারের পক্ষেই সম্ভব। একইসাথে নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে মানবতার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, তা তিনি বিশ্ববিবেকের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, এই সংকটের উৎস মিয়ানমারে, সমাধানও সেখানেই। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান।
জলবায়ু ন্যায়বিচার ও থ্রি-আর কৌশলে নতুন বাংলাদেশ :
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম, অথচ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে আমাদের অবদান নগণ্য। প্রধানমন্ত্রী কপ-৩১ এ জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অর্থায়নের জন্য জোরালো দাবি তুলেছেন। একইসাথে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজের মতো যুগান্তকারী উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ শুধু সহায়তা চায় না, নিজেদের সক্ষমতাও বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি ফ্যাসিবাদের ক্ষত সারাতে তিনি যে ‘থ্রি-আর’ – Recovery, Restoration and Reconstruction – কৌশলের কথা বলেছেন, তা একটি ধ্বংসস্তূপ থেকে জাতিকে পুনর্গঠনের মহাপরিকল্পনা। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো মানুষের আস্থা, সেই আস্থা ফিরিয়ে আনাই তাঁর লক্ষ্য।
তারুণ্য, নারী ও শিক্ষায় বৈপ্লবিক স্বপ্ন : ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগিয়ে তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর, বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা এবং স্টার্টআপ খাতে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের ঘোষণা প্রমাণ করে, তিনি কোটি তরুণের আইকন, দেশনায়ক। তাঁর মা যেমন নারী জাগরণের প্রতীক ছিলেন, তেমনি তিনি নারী শিক্ষা, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও স্নাতক পর্যন্ত বিনাবেতনে শিক্ষার সুযোগ এবং প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ভবিষ্যতে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা করেছেন, যা নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট, জিডিপির ৫ শতাংশ বিনিয়োগ, স্কুল ইউনিফর্ম ও দুপুরের খাবার এবং সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’ অন্তর্ভুক্তি একটি মেধাবী ও সুস্থ জাতি গঠনের স্বপ্ন। তিনি দেখিয়েছেন, বিএনপির ৩১ দফার ৭৩ শতাংশ জাতিসংঘের এসডিজির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ – এটি বিশ্বমানের উন্নয়ন দর্শন।
বিশিষ্টজনদের দৃষ্টিতে ঐতিহাসিক ভাষণ : এই ঐতিহাসিক ভাষণ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, বিএনপির গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোঃ মোর্শেদ হাসান খান বলেন, “জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের ভাষণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। একই পরিবারের তিন সদস্যের বিশ্বমঞ্চে ভাষণ দেওয়ার বিশ্বরেকর্ড ১৮ কোটি মানুষের গৌরব। সম্পূর্ণ বাংলায় দেওয়া এই ভাষণে ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন বাংলাদেশের চিত্র, ফিলিস্তিনের পক্ষে বজ্রকণ্ঠ, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ন্যায়বিচার, থ্রি-আর কৌশল, তরুণদের কর্মসংস্থান ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো যুগান্তকারী চিন্তা ছিল সুস্পষ্ট ও বিশ্বমানের। শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বিনিয়োগের ঘোষণা একটি মেধাবী জাতি গঠনে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে। তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি সমগ্র জাতির নেতা।”
পরিশেষে, ভাষণের শেষে প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমান যে মন্ত্র উচ্চারণ করেছেন – “সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ” – এটি আজ জাতীয় ঐক্যের স্লোগানে পরিণত হয়েছে। দলমত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছেন, তা একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি। আমি নিজেও জিয়া পরিবারের একজন ভক্ত, আমার পরিবারের সবাই বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত। ছোটবেলা থেকে শহীদ জিয়ার আদর্শ ও দেশনেত্রীর আপসহীন সংগ্রাম দেখে বড় হয়েছি। আজ যখন দেখি সেই পরিবারেরই সন্তান বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে উজ্জ্বল করছেন, তখন চোখে আনন্দের অশ্রু চলে আসে। তাই এই অর্জনের পর আমাদের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। দু’হাত তুলে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি – আল্লাহ যেন দেশনায়ক তারেক রহমান, ডা. জোবাইদা রহমান, ব্যারিস্টার জাইমা রহমানসহ জিয়া পরিবারের সকল সদস্যকে সকল বিপদ-আপদ থেকে হেফাজত করেন, সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু দান করেন। আর স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়াউর রহমান ও গণতন্ত্রের মাতা মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকামে কবুল করেন। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, জিয়া পরিবার জিন্দাবাদ, দেশনায়ক তারেক রহমান জিন্দাবাদ।
আজকালের কন্ঠ/আর বি