একটি কল্যাণমুখী ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো মেধার স্বীকৃতি এবং সুশাসনের অবাধ নিশ্চয়তা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকুরীর দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়াটি কেবল একটি পেশাগত লড়াই নয়, বরং একেকজন প্রার্থীর জীবন-সংগ্রামের ‘অগ্নিপরীক্ষা’। প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষার ম্যারাথন বৈতরণী পার হয়ে, জানা-অজানা হাজারো সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা জয় করে যখন একজন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন, তখন তা কেবল তার ব্যক্তিগত বিজয় থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটি পরিবারের স্বপ্নপূরণের চূড়ান্ত মুহূর্ত। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সাম্প্রতিক সময়ে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও বিপুল সংখ্যক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদপ্রার্থীকে রহস্যজনকভাবে নিয়োগপত্র না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। এই প্রশাসনিক স্থবিরতা ও দৃশ্যমান বঞ্চনা কেবল যুবসমাজের অধিকার হনন করছে না, বরং জনমনে গভীর ক্ষোভের সঞ্চার করছে। অপরাধবিজ্ঞান এবং সুশাসনের একজন বিশ্লেষক হিসেবে আমার মনে এই প্রশ্নটি তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে—এই কৃত্রিম সংকট কি কেবলই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নাকি জনগ নির্বাচিত সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার পেছনে সক্রিয় কোনো গভীর অন্তর্ঘাত ও ষড়যন্ত্রের অংশ?
ফরাসি দার্শনিক জঁ-জাক রুশোর ‘সামাজিক চুক্তি’ (Social Contract) তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, নাগরিক যখন রাষ্ট্রের সকল নিয়ম মেনে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে, তখন রাষ্ট্র তার অধিকার বুঝিয়ে দিতে বাধ্য থাকে। চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্তির পর নিয়োগপত্র না দেওয়া রাষ্ট্রের সেই অলিখিত চুক্তির চরম লঙ্ঘন। আমাদের দেশে প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী, চূড়ান্ত তালিকার পর পুলিশ ভেরিফিকেশন বা তদন্তে নেতিবাচক কিছু এলে নিয়োগ আটকে যায়। আইন ও বিধির আলোকে সেই তদন্তের সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক কারণ থাকতে হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিবাদের দোসর বা রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে জনগণের তীব্র আপত্তি ও উদ্বেগ থাকাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক। কিন্তু কোনো স্বচ্ছ কারণ না দর্শিয়ে, ঢালাওভাবে শত শত যোগ্য প্রার্থীকে নিয়োগপত্র না দিয়ে মাসের পর মাস অপেক্ষায় রাখা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
এই দীর্ঘসূত্রিতাকে কেন্দ্র করে জনমনে ইতোমধ্যে নানা নেতিবাচক ধারণার ডালপালা গজাতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ মনে করছে, এটি সেই বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের স্বৈরাচারী ও পক্ষপাতমূলক আচরণেরই ধারাবাহিকতা। আবার সমাজের কিছু অংশের ধারণা—এটি হয়তো পুলিশ বা প্রশাসনের একাংশের অসদুপায় ও ‘বাণিজ্য ঘাটতি’ মেটানোর অপকৌশল। তবে অপরাধবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের গভীরতর দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে এর পেছনে আরও মারাত্মক একটি রূপরেখা দৃশ্যমান হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘পলিটিক্যাল অর্ডার ইন চেঞ্জিং সোসাইটিজ’ তত্ত্বের সূত্র ধরে বলা যায়, যখন কোনো রূপান্তরকালীন সমাজে জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশার বিপরীতে প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়, তখন তা তীব্র গণ-অসন্তোষের জন্ম দেয়। বর্তমান সরকারকে অস্থিতিশীল করতে এবং জনগণের আস্থা ধুলিসাৎ করতে ষড়যন্ত্রকারীরা ঠিক এই মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্রটিই বেছে নিয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে।
মেধাবী যুবসমাজকে বঞ্চিত করে তিলে তিলে একটি পাহাড়সম জনঅসন্তুষ্টি গড়ে তোলার এই প্রক্রিয়াটি আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি সুদূরপ্রসারী প্রশাসনিক অন্তর্ঘাত (Bureaucratic Sabotage)। প্রশাসনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুবিধাবাদী ও ষড়যন্ত্রকারী চক্র সুকৌশলে সরকারকে সাধারণ মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে চাইছে। তারা ভালো করেই জানে, প্রাথমিক শিক্ষকদের মতো একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ পুরো সমাজব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
অতএব, সাধু সাবধান! রাষ্ট্র ও সুশাসনের স্বার্থে এই রহস্যের যবনিকাপাত হওয়া জরুরি। আমি সংশ্লিষ্ট সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত ও জোরালো অনুরোধ জানাচ্ছি—অনতিবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। কেন এবং কার ইশারায় এই যোগ্য ও সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের নিয়োগপত্র আটকে রাখা হয়েছে, তা নিরূপণ করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হোক। ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচন করে মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা এবং সরকারের ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। মেধার অধিকার প্রতিষ্ঠা পাক, সুশাসন জয়ী হোক।
লেখক: প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান
উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ।
আজকালের কন্ঠ/আর বি