Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬ , ৪:৪৫ পূর্বাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬ , ৬:৫৪ অপরাহ্ণ

লক্ষ্মীপুরে পানিতে ডুবে ১২৫ শিশুর মৃত্যু, রামগতি-কমলনগরের উদ্বেগজনক চিত্র

লেখকঃ জাকির হোসেন জুয়েল, লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধি

লক্ষ্মীপুরে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা যেন নিত্যদিনের আতঙ্ক হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ প্রকাশিত জেলা পর্যায়ের এক বছরের সরকারি হিসাবে মাত্র এক বছরেই পানিতে ডুবে ১২৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রামগতি ও কমলনগরেই মারা গেছে ৩৭ শিশু। এরপরও থেমে নেই প্রাণহানি। চলতি ২০২৬ সালেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। কোথাও নিছক দুর্ঘটনা, আবার কোথাও মৃত্যুর কারণ নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত লক্ষ্মীপুরে পানিতে ডুবে অন্তত ১২৫ শিশুর মৃত্যু হয়। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৪০, রায়পুরে ২০, রামগঞ্জে ২৮, কমলনগরে ২৮ এবং রামগতিতে ৯ শিশু মারা যায়। অর্থাৎ শুধু রামগতি ও কমলনগরেই ওই এক বছরে প্রাণ হারিয়েছে ৩৭ শিশু।

সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন বলেন, পুকুর, খাল-বিলসহ জলাশয়বহুল লক্ষ্মীপুরে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার তুলনামূলক বেশি। অধিকাংশ মৃত্যুর পেছনে অবহেলা ও সচেতনতার অভাব রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

২০২৬ সালেও ঘটছে একের পর এক মৃত্যু

চলতি বছরের ৮ জুলাই রামগতি উপজেলার চররমিজ ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খন্দকারপাড়ায় পুকুরের পানিতে ডুবে মায়েশা আক্তার (সাড়ে ৩) ও মুজাহিদুল ইসলাম (৩) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়। স্বজনদের ভাষ্য, খেলাধুলার সময় মুজাহিদ পুকুরে পড়ে গেলে তাকে বাঁচাতে গিয়ে মায়েশাও পানিতে নামে। পরে দুজনকেই উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এর ১৮ দিন পর, ২৬ জুলাই লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার লাহারকান্দি ইউনিয়নের আবিরনগরে বাড়ির পাশের পুকুর থেকে ছয় বছর বয়সী জান্নাত আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সকালে খেলাধুলার পর শিশুটিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে পুকুর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

সেপ্টেম্বরেও ঘটেছে হৃদয়বিদারক ঘটনা। ৬ সেপ্টেম্বর লক্ষ্মীপুর সদরে এক বৃদ্ধকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে তার দুই নাতি-নাতনির পানিতে ডুবে মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনা আবারও সামনে এনেছে শিশুদের বাড়ির আশপাশের জলাশয়ের নিরাপত্তার বিষয়টি।

কমলনগরে পানিতে ডুবে মৃত্যু, নাকি অন্য কিছু?

সাম্প্রতিক সময়ে কমলনগরের একটি শিশুমৃত্যু নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। পাঁচ বছর বয়সী নুসরাত জাহান আলিফার পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে পরিবারের দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।

শিশুটির বাবা দিদার হোসেন দাবি করেছেন, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়; তার মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে মায়ের পরিবারের সদস্যরা এ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, আলিফা অসাবধানতাবশত পানিতে পড়ে মারা গেছে।

ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে শিশুটির মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। কমলনগর থানার ওসি ফরিদুল আলম জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

আরেক শিশুর মৃত্যুতেও হত্যার অভিযোগ

এর আগে কমলনগরে রোহান নামে আরেক শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করেও হত্যার অভিযোগ সামনে আসে। শিশুটির বাবা-মায়ের অভিযোগ, তাকে শ্বাসরোধে হত্যার পর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।

এ ঘটনায় আদালতে অভিযোগ করা হলে তদন্তের জন্য জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এটি পরিবারের অভিযোগ; তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

১২৫ মৃত্যুর পরও কি শিক্ষা হয়নি?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। এক বছরের সরকারি হিসাবেই যখন লক্ষ্মীপুরে ১২৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তখন রামগতি ও কমলনগরের মতো জলাশয়বহুল উপজেলায় শিশুদের নিরাপত্তায় কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হয়েছে?

ঝুঁকিপূর্ণ পুকুর, খাল ও ডোবা চিহ্নিত করে সুরক্ষা ব্যবস্থা করা হয়েছে কি না, বসতবাড়ির পাশে অরক্ষিত জলাশয়গুলোতে শিশুদের প্রবেশ ঠেকাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা জরুরি।

আর যেসব শিশুর মৃত্যু নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগ উঠছে, সেসব ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত, ঘটনাস্থলের আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং তদন্তের ফলাফল সামনে এনে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

উদ্বেগ রামগতি-কমলনগর ঘিরে

সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ এক বছরের হিসাবে শুধু রামগতি ও কমলনগরেই ৩৭ শিশুর মৃত্যু—এটি নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের সতর্কবার্তা।

এখন প্রয়োজন শুধু মৃত্যুর পর শোক প্রকাশ নয়। ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় চিহ্নিতকরণ, শিশুদের সাঁতার শেখানো, অভিভাবকদের সচেতন করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি বাড়ানো।

কারণ একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয় না—একটি পরিবারকে আজীবনের শোকে ঠেলে দেয়। লক্ষ্মীপুরে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা বন্ধে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

প্রিন্ট করুন