Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬ , ১:৩৭ অপরাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬ , ১২:০১ অপরাহ্ণ

ফারাক্কার অভিশাপ থেকে পদ্মা ব্যারেজের আশীর্বাদে: দক্ষিণ-পশ্চিমের ত্রাণকর্তা খৈয়াম ও তারেক রহমান

লেখকঃ জুবাইয়া বিন্তে কবির

নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী কেবল

মানচিত্রের রেখা নয়, এটি অস্তিত্বের ধমনী। পদ্মা আজ কেবল নদীর নাম নয়, এটি টিকে থাকার প্রশ্ন। আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যে দুটি নাম কোটি মানুষের হৃদয়ে প্রদীপের মতো জ্বলছে, তারা হলেন জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমান এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের অতন্দ্র প্রহরী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। একজন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে স্বপ্ন দেখছেন আত্মনির্ভর বাংলাদেশের, আরেকজন সেই স্বপ্নকে মাটিতে, নদীর চরে বাস্তবে রূপ দিতে ৪৮ বছর ধরে লড়ছেন।

ফারাক্কা-পরবর্তী দীর্ঘ শুষ্কতার ইতিহাস : ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারেজ চালুর পর শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। এর নির্মম ফল ভোগ করে রাজবাড়ী, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, যশোর, নড়াইল, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। গড়াই, মধুমতী, মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাসিয়া নাব্যতা হারিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। লবণাক্ততা গ্রাস করে ফসলের মাঠ, সুন্দরবনের শ্বাসমূল আজ বিষে নীল। দেশের তিন ভাগের এক ভাগ ভূমি মরুকরণের পথে।

পদ্মা ব্যারেজ: কেবল অবকাঠামো নয়, একটি দর্শন :
এই বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারেজ সাধারণ অবকাঠামো নয়, এটি পানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্যের দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় কৌশল। এর মূল লক্ষ্য শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রিত বণ্টনের মাধ্যমে সেচ, নৌ-পরিবহন, মৎস্য ও জলবিদ্যুৎ নিশ্চিত করা।

ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: ১৩ মে ২০২৬ : বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৩ মে ২০২৬ অবিস্মরণীয়। এদিন সচিবালয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার নেতৃত্বেই অনুমোদিত হয় ‘পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প। একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভায় সভাপতিত্ব করেন।

প্রকল্পের সর্বশেষ রূপরেখা: আজ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য : সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। এটি জাতীয় জিডিপিতে ০.৪৫ শতাংশ অবদান রাখবে এবং বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ সুবিধা বয়ে আনবে। রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় পদ্মা নদীর ওপর ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারেজ নির্মিত হবে, এতে থাকছে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, ২টি ফিশ পাস এবং নেভিগেশন লক। ১১৩ মেগাওয়াটের দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৭৬.৪ ও ৩৬.৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে।

সুফল: ২৪ জেলা, ৭ কোটি মানুষ : প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা এবং প্রায় ৭ কোটি মানুষ উপকৃত হবে। পানিসম্পদ মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা, রাজশাহীসহ ২৪ জেলার প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ নিশ্চিত হবে। জলাধারটি হবে ১৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ, ৬২৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং প্রায় ২৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করবে।

জন্ম ও শেকড়: পদ্মার পললে গড়া মানুষ : আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ামের জন্ম ২৫ মে ১৯৫৭ সালে রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মদাপুর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামে। হাবাসপুরে তার নানাবাড়ি, মায়ের জন্মস্থানও সেখানে। তাই তিনি বলেন, “হাবাসপুরের প্রতি আমার আলাদা আবেগ রয়েছে।” এই মাটির টানই তাকে পদ্মা ব্যারেজের আজীবন সৈনিকে পরিণত করেছে।

শিক্ষা ও আদর্শিক দীক্ষা : গোপালপুরের প্রাথমিক ও স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তার শিক্ষার ভিত্তি। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী দর্শন, খাল খনন ও নদী শাসনের স্বপ্নে অনুপ্রাণিত। পরিবার থেকেই পেয়েছেন মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ও সততার শিক্ষা। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখলেও এলাকাবাসী জানে, তার পরিবার প্রজন্ম ধরে সামাজিক সেবায় নিয়োজিত।

তৃণমূল থেকে জাতীয় নেতা : ২০০০ সাল পর্যন্ত একটানা তিনবার রাজবাড়ী পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে তিনি বিরল রেকর্ড গড়েন। ২০০১ সালে রাজবাড়ী-১ (সদর-গোয়ালন্দ) আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও রাজবাড়ী জেলা বিএনপির সভাপতি। প্রতিকূল ২০০৮ ও ২০১৮ সালেও তিনি মাঠ ছাড়েননি।

যিনি দাবিকে জাতীয় এজেন্ডায় তুলেছেন : জাতীয় পদ্মা ব্যারেজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে তিনি বছরের পর বছর সেমিনার, জনমত গঠন ও নীতি-সংলাপ চালিয়েছেন। তিনি বারবার বলেছেন, এটি কেবল রাজবাড়ীর দাবি নয়, জাতীয় পানি নিরাপত্তার প্রশ্ন। শহীদ জিয়া যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, বেগম খালেদা জিয়া যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, আজ তারেক রহমান তা বাস্তবায়ন করছেন।

দেশনায়ক তারেক রহমান: কথা রাখার নেতা : জানুয়ারি ২০২৬-এ রাজশাহীর জনসভায় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ক্ষমতায় গেলে দ্রুত পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ করবেন। ১৩ মে ২০২৬-এ একনেক সভায় সভাপতিত্ব করে তিনি কথা রেখেছেন। সর্বশেষ ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি হাবাসপুর চরে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে ঘোষণা দেন, আগামী বছরের মার্চের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে ব্যারেজের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন ঘোষণা করবেন এবং দেশীয় অর্থায়নেই সম্পূর্ণ হবে প্রকল্পটি।

কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতির নতুন দিগন্ত : ব্যারেজ হলে বোরো, গম, ভুট্টা, ডাল, সবজির জন্য মিঠা পানির হাহাকার থাকবে না, ভূগর্ভস্থ পানির চাপ কমবে, উৎপাদন খরচ অর্ধেকে নামবে। নদীতে প্রবাহ ফিরলে জীববৈচিত্র্য, মাছের প্রজনন ও নৌপথ সচল হবে। সুন্দরবনে লবণাক্ততা কমবে। গোয়ালন্দ-দৌলতদিয়া নৌ-বন্দর আবার প্রাণ ফিরে পাবে, গড়ে উঠবে কৃষিভিত্তিক শিল্প, হিমাগার ও নদী-পর্যটন।

বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের দর্শন : আবেগ নয়, বিজ্ঞান দিয়ে নদী শাসন করতে হবে – এটি খৈয়ামের মূলমন্ত্র। তিনি চান বুয়েট, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA), ফিশ পাস ও পলি ব্যবস্থাপনাসহ আন্তর্জাতিক মানের নকশা। একটি ভুল সিদ্ধান্ত নদীকে মারতে পারে, একটি সঠিক সিদ্ধান্ত সভ্যতাকে বাঁচাতে পারে।

২০২৬-এ প্রত্যাবর্তন ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-এ পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে নদীর সংস্কৃতি বোঝা মানুষই সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ সেবক। তার স্বপ্ন – ব্যারেজ কাম দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, রাজবাড়ীকে মডেল জেলা করা, গোয়ালন্দকে আধুনিক রিভারপোর্ট ও পাংশা-কালুখালীকে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ হাব হিসেবে গড়ে তোলা।

পরিশেষে, ইতিহাস অনেককেই ভুলে যায়, কিন্তু যারা নদী বাঁচায়, তাদের ভোলে না। পদ্মা ব্যারেজের ইতিহাসে সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে দুটি নাম – দেশনায়ক তারেক রহমান, যিনি নির্বাসনেও পদ্মার খবর রেখেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী হয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এবং আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, যিনি ৪৮ বছর ধরে এই স্বপ্নকে বুকে লালন করেছেন। জাতীয় দৈনিক দিনকাল পরিবারের পক্ষ থেকে এই দুই নেতার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সাফল্যের জন্য দোয়া করি। তাদের হাত ধরেই পদ্মার বুকে জেগে উঠুক নতুন জীবনরেখা, রাজবাড়ী থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত ফিরে আসুক নদীর কলতান।

আজকালের কন্ঠ/আর বি

প্রিন্ট করুন