Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ , ১১:৪৭ অপরাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ , ৪:৩৭ অপরাহ্ণ

কেন্দুয়ার তিন দশকের সাধনা দেশবরেণ্য বাউল কবি সালাম সরকারের, শুধু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায়

লেখকঃ সুশীল আচার্য্য, নেত্রকোনা প্রতিনিধি

যার অন্তরচক্ষু খোলা, তাকে দমায় কে? লেখাপড়া না থাকলেও নিজের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে জয় করেছেন লাখো মানুষের হৃদয়। বর্তমানে তাঁর লেখা গান ছড়িয়ে পড়েছে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও। বলছি, বরেণ্য বাউল কবি নেত্রকোনার সালাম সরকারের কথা।

গত তিন দশকেরও বেশি সময় যাবত বাউল সাধনায় নিয়োজিত এই গুণী শিল্পী ও কবি। ষাট বছর বয়সী এই শিল্পীর সাধারণ জীবনযাপন। শারীরিক অসুস্থতাসহ কিছুটা অভাব-অনটন তাঁর সংসারে লেগেই আছে। তবুও কেন্দুয়া পৌরশহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার নিজ বাসায় বসে এখনও তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় গান সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। দুই হাজারেরও বেশি গানের রচয়িতা সালাম সরকার অদ্যাবধি রয়ে গেছেন রাষ্ট্রীয় দৃষ্টির অগোচরে। তাই ভক্ত ও এলাকাবাসীর দাবি, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানসহ অচিরেই সালাম সরকারের পাশে দাঁড়াবে বর্তমান সরকার।

১৯৬৭ সালের ৪ আগস্ট নেত্রকোনার মদন উপজেলার জয়পাশা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন সালাম সরকার। তার পিতা আব্দুল জব্বার, মা পরিস্কারেরনেছা। জন্মভূমি মদন উপজেলায় হলেও পরিবারসহ দীর্ঘ বছর ধরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন কেন্দুয়ায়। এখানেই সংসার পেতেছেন। স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে চলছে তার জীবন। এরইমধ্যে সময় অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপন, বিনোদনের ধরন, গান শোনার মাধ্যম। কিন্তু সালাম সরকারের গানের জগৎ বদলায়নি। এখনো তার ভাবনা জুড়ে শুধু গান আর গান। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি লিখছেন লোকগান। তার লেখা গান গেয়েছেন দেশের বিভিন্ন খ্যাতিমান ও নবীন শিল্পী। সহজ-সরল ভাষায় লেখা এসব গান গ্রামীণ মানুষের খুব কাছের। প্রেমের আকুলতা, বিচ্ছেদের কষ্ট, মানুষের প্রতি মানুষের টান, জীবনের সুখ-দুঃখ সবকিছুই যেন চেনা কোনো গল্পের মতো উঠে আসে তার গানের কথায়। এ কারণেই হয়তো তার গান শুধু মঞ্চে আটকে থাকেনি। শিল্পীর কণ্ঠ পেরিয়ে পৌঁছেছে সাধারণ মানুষের কাছে। অসংখ্য গান ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু এত দীর্ঘ পথচলার পরও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির তালিকায় নাম ওঠেনি এই বরেণ্য বাউল কবির। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার কিংবা স্বাধীনতা পুরস্কারের মতো রাষ্ট্রীয় সম্মাননা এখনো তার নাগালের বাইরে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলা লোকসংগীতে অবদান রেখে চলা এই শিল্পীর এমন অবস্থায় আক্ষেপ রয়েছে তার ভক্ত ও অনুরাগীদের মধ্যে।

স্থানীয়দের দাবি, জনপ্রিয়তা কিংবা পরিচিতির বিচারে নয়, তার দীর্ঘ সংগীত সাধনা ও সৃষ্টিকর্মের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া উচিত। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হলেও রাষ্ট্র যেন এই প্রবীণ শিল্পীর অবদানের স্বীকৃতি দেয়- এটাই তাদের প্রত্যাশা।

তবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পাওয়ায় কোনো অভিযোগ নেই সালাম সরকারের। পুরস্কার বা রাষ্ট্রীয় সম্মাননার হিসাব কষে তিনি গান করেননি। গান তার কাছে পেশার চেয়েও বেশি কিছু। এ যেন জীবনযাপনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমান জীবনের বাস্তবতা অবশ্য কঠিন। বয়স বেড়েছে।

সংসারের প্রয়োজন কমেনি। বরং জীবনের শেষভাগে এসে স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে তাকে। তারপরও গান ছাড়েননি। ‘জীবনে ভক্তদের যে ভালোবাসা পেয়েছি, তার জন্যই হয়তো এখনো বেঁচে আছি। এখনো গান লিখছি এবং গাইছি। নতুন নতুন আরও গান উপহার দেওয়ার চেষ্টা করছি’ বলেন সালাম সরকার।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রসঙ্গ তুললে তার কণ্ঠে শোনা যায় না কোনো ক্ষোভ। বরং আছে দীর্ঘ অপেক্ষার শান্ত স্বর। তিনি বলেন, ‘পুরস্কার বা সম্মাননার আশায় গান করিনি। গান আমার জীবন। জীবনের তাগিদেই গান করি। তবে সরকার যদি আমাকে যোগ্য মনে করে, তাহলে অবশ্যই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেবে আমি সেই অপেক্ষাতেই আছি।’

নেত্রকোনা জেলা প্রশাসন জানায়, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা পদক পুরস্কারের প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু প্রটোকল রয়েছে। আমাদের কাছে রাষ্ট্রীয়ভাবে এ সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হলে আমরা অবশ্যই তা প্রেরণ করব।

বাউল কবি সালাম সরকারের চিন্তা থেকে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে নতুন শব্দ, নতুন গান। সৃষ্টি হচ্ছে হৃদয় ছোঁয়া নতুন নতুন সুর। হয়তো কোনো একদিন সেই সুর পৌঁছে যাবে রাষ্ট্রের কানেও। ততদিন পর্যন্ত জীর্ণ ঘরে বসেই গান লিখে যাবেন সালাম সরকার।

‎আজকালের কন্ঠ/আর বি

প্রিন্ট করুন