পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে (পবিপ্রবি) শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক, গবেষণানির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করাই বর্তমান প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দুমকি উপজেলা ও পটুয়াখালী জেলায় কর্মরত বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত তিন মাসে পবিপ্রবিকে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে এবং আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে নিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসনিক কার্যক্রম, নির্মাণকাজ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে গতি আনতে কাজ চলছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের বিভিন্ন অনিয়ম ও শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যমান অস্থিরতা কাটিয়ে একটি ইতিবাচক ও কর্মমুখর পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শাখায় গিয়ে অফিস কার্যক্রম নিশ্চিত করা হচ্ছে। শিক্ষকদের শিক্ষা ও গবেষণায় আরও সম্পৃক্ত করতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে চলমান নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করতে পরিকল্পনা ও প্রকৌশল বিভাগের সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পবিপ্রবিতে বর্তমানে কৃষি, মৎস্যবিজ্ঞান, ভেটেরিনারি, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান, ব্যবসায় প্রশাসন, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, আইন ও ভূমি প্রশাসন, প্রকৌশল এবং সমুদ্রবিজ্ঞানসহ ১০টি অনুষদ চালু রয়েছে উল্লেখ করে ভিসি বলেন, দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে নতুন বিভাগ ও অনুষদ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন, ফিজিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড স্পোর্টস এবং নার্সিং অ্যান্ড হেলথ সায়েন্স বিভাগের সমন্বয়ে নতুন হেলথ সায়েন্স অনুষদ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮তম রিজেন্ট বোর্ড সভায় অনুমোদিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হবে। আগামী শিক্ষাবর্ষে এ অনুষদে শিক্ষার্থী ভর্তির পরিকল্পনা রয়েছে।
ভিসি বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানভিত্তিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার নতুন ক্ষেত্র তৈরিতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শিক্ষার্থীবান্ধব বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের আর্থিক সামর্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় বরিশাল ও পটুয়াখালীতে টিউশনি ও অন্যান্য কাজে নিয়মিত যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীদের বাসভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। পরিবহন, অর্থ ও হিসাব শাখায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসকে মাদক ও র্যাগিংমুক্ত করতে বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মাদক নিরোধে এবার ডোপ টেস্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এটি শতভাগ নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকবে। হলগুলোতে র্যাগিংমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা ধীরে ধীরে সমাধান করা হচ্ছে।
পবিপ্রবির আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং ও গবেষণার বিষয়ে ভিসি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দুই যুগ পর র্যাঙ্কিং উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট আধুনিকায়ন ও সর্বক্ষেত্রে অটোমেশন চালুসহ বেশ কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণাগারে শিক্ষা ও গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি এবং গবেষণার ফলাফল দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দেওয়াকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, বিদেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পবিপ্রবি ‘ইন্টারন্যাশনাল কোলাবরেশন ফর ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড সাসটেইনেবল অ্যাগ্রিকালচার’ (ICFSA)-এর মালয়েশিয়ায় একমাত্র বাংলাদেশি সদস্য। এতে বিশ্বের ১৫টি দেশের ২০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত রয়েছে। সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার ইউনিভার্সিতাস নেগেরি পাদাংয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনসহ বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জিএসটি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা প্রসঙ্গে ভিসি বলেন, এবার সর্বোচ্চ সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ে গঠিত জিএসটি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্ব পবিপ্রবি নিয়েছে। ইতোমধ্যে ভর্তি পরীক্ষার তারিখও ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া কৃষি গুচ্ছ ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গুচ্ছের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
পবিপ্রবির শিক্ষকদের গবেষণার সক্ষমতার প্রশংসা করে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক মেধাবী শিক্ষক রয়েছেন এবং গবেষণার জন্য ভালো সুযোগ রয়েছে। শিক্ষকদের গবেষণায় উৎসাহিত করার পাশাপাশি ভালো গবেষণা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে অবদান রাখা শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চলমান নির্মাণকাজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেমে থাকা কাজগুলো চালু করতে ঠিকাদার, কনস্ট্রাকশন কনসালট্যান্সি ফার্মের প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করা হয়েছে। বর্তমানে নির্মাণকাজগুলো দ্রুত এগিয়ে চলছে। এসব কাজের অগ্রগতির ওপর প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ভিসি বলেন, জীবনে ফিক্সড মাইন্ডসেট ও গ্রোথ মাইন্ডসেট—দুই ধরনের মানসিকতা দেখা যায়। ফিক্সড মাইন্ডসেট মানুষকে একটি গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখে। শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে কঠোর পরিশ্রম, সঠিক পরিকল্পনা ও শেখার আগ্রহের মাধ্যমে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় পবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের পাশে আছি। শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সবার সহযোগিতায় এ প্রতিষ্ঠানকে একটি সেন্টার অব এক্সিলেন্সে পরিণত করতে চাই, ইনশাআল্লাহ।’
মতবিনিময় সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. এ. বি. এম. সাইফুল ইসলাম, ট্রেজারার প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, প্রক্টর প্রফেসর আবুল বাশার খান, অফিস অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক ড. হাচিব মোহাম্মদ তুষার, প্রধান খামার তত্ত্বাবধায়ক মো. আরিফুর রহমান, জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক ড. রাহাত মাহমুদ, উপ-পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান সবুজসহ বিশ্ববিদ্যালয় এবং দুমকি ও পটুয়াখালীতে কর্মরত বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
আজকালের কন্ঠ/আর বি