Header
প্রিন্ট তারিখঃ অক্টোবর ২৪, ২০২৬ , ৫:০৬ পূর্বাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬ , ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ

পায়রার অবিরাম ভাঙনে বিলীনের পথে বাহেরচর গ্রাম

লেখকঃ রাজিবুল ইসলাম, নিজস্ব প্রতিনিধি(পটুয়াখালী)

পায়রা নদীর অবিরাম ভাঙনে অস্তিত্ব হারানোর পথে পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রাম। গত কয়েক দিনের ভাঙনে নতুন করে অন্তত ২০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে এখন সরকারি সড়কের পাশে আশ্রয় নিয়েছে। দীর্ঘদিনের ভাঙনে এ পর্যন্ত দেড় শতাধিক পরিবার নিঃস্ব হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। নদীভাঙন অব্যাহত থাকায় এখন হুমকির মুখে রয়েছে ৩২ নম্বর আঙ্গারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন সেল্টার, সিকদার বাড়ি জামে মসজিদ ও মোল্লা বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বাহেরচরে নদীভাঙন দীর্ঘদিনের। বছরের পর বছর নদীর পেটে গেছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও গাছপালা। ভাঙন থেকে বাঁচতে অনেক পরিবার ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত ঘরবাড়ি সরিয়েছে। কিন্তু বারবার সরতে সরতে এখন অনেকেরই আর যাওয়ার জায়গা নেই। ফলে ভিটেমাটি হারানো পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে সরকারি সড়কের পাশে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, পায়রা নদীর পাড়ে ভাঙনের ক্ষত স্পষ্ট। কোথাও নদীর কিনারে ঝুলছে বসতভিটার শেষ অংশ, কোথাও সদ্য ভেঙে পড়া ঘরের ধ্বংসাবশেষ। ভাঙনের আতঙ্কে অনেকে ঘরবাড়ি ও মালামাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। আর যাদের শেষ আশ্রয়টুকুও নদীতে চলে গেছে, তারা রাস্তার পাশে পলিথিন টাঙিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

ভুক্তভোগী নিটুলী রানী বলেন, ‘ইতোমধ্যে সাতবার ভিটেমাটি হারিয়েছি। সর্বশেষ আশ্রয়টুকুও নদীতে চলে গেছে। এখন রাস্তার পাশে থাকতে হচ্ছে। আর যাওয়ার কোনো জায়গা নাই, সব নদীতে গেছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা জাকির খান (৫০) বলেন, ‘অনেক মানুষ আইছে, অনেক কথা কইছি, কিন্তু কোনো কাজ হয় নাই। কেউ আমাগো দিকটা দেখে না।’

রিপন মাল (৩৭) বলেন, ‘বাপ-দাদার সময় থেকে ভাঙন চলছে। জীবনে পাঁচ-ছয়বার ঘর সরিয়েছি। এখন বাধ্য হয়ে বাজারে ভাড়া বাসায় থাকছি।’

আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন সিকদার দাবি করেন, এ পর্যন্ত বাহেরচর এলাকায় প্রায় ৩৫০ একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। তাঁর দাবি, ১৯৭৭-৭৮ সালে নদীর ওপারে নতুন চরে ৬০টি পরিবারের জন্য ৯০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে বাকেরগঞ্জের লোকজন তা দখল করে রাখায় বাহেরচরের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ওই জমির সুবিধা পায়নি।

৭৫ বছর বয়সী ভুক্তভোগী আব্দুস সাত্তার খান বলেন, ‘বারবার ভাঙনে এখন আমাদের কিছুই নাই। বাধ্য হয়ে রাস্তার ওপর থাকতে হচ্ছে।’ তিনি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানান।

আরেক ভুক্তভোগী ওলিউল্লাহ সিকদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের আমলে সামান্য কিছু বস্তা ফালাইছিলো। পরে ড. ইউনূস সরকার গেলো, এখন বিএনপি সরকার আছে; কিন্তু আমাগো ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না।’

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে পুরো ৩ নম্বর ওয়ার্ডই অস্তিত্বের সংকটে পড়বে। ইউপি সদস্য শাহীন গাজী বলেন, ‘পায়রা নদীর ভাঙনে আমার ওয়ার্ড প্রায় বিলুপ্তির পথে। দ্রুত ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

আঙ্গারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জিল্লুর রহমান বলেন, বাহেরচর গ্রাম রক্ষায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তায় প্রশাসনের জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।

দুমকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

এ ব্যাপারে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ড তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ শাহানেয়াজ তালুকদারকে মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি ব্যাপারটা জানেন না বলে অসুস্থতার কথা বলে কল কেটে দেন।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পায়রা নদীর বুকেই হারিয়ে যেতে পারে বাহেরচর গ্রামের বড় একটি অংশ। একই সঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা স্থাপনা ও আরও শতাধিক পরিবারকে রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

আজকালের কন্ঠ/আর বি

প্রিন্ট করুন