Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ , ১২:১৭ অপরাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬ , ৪:৪১ অপরাহ্ণ

কুড়িগ্রামে চাহিদার তুলনায় মিলছে কম সার, কৃষকদের ক্ষোভ

লেখকঃ কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি

কুড়িগ্রামে আমন ধান ও আগাম শীতকালীন সবজি চাষের মৌসুমে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সার না পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, জেলায় ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সারের যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে, তার তুলনায় বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

সার সংকটকে কেন্দ্র করে জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের ভিড় ও দীর্ঘ লাইনের পাশাপাশি উত্তেজনাও দেখা দিয়েছে। এর আগে ভূরুঙ্গামারীতে এক ডিলারের গুদামে হামলা ও সার লুটের ঘটনা ঘটে। অন্য একটি ঘটনায় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও ওঠে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইউনিয়নের পাশাপাশি ওয়ার্ড পর্যায়ে সার বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। ভূরুঙ্গামারীর লক্ষ্মীর মোড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত ডিলারের কাছে অল্প পরিমাণ সার থাকায় অনেক কৃষককে খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে।

স্থানীয় ডিলার মতিয়ার রহমান জানান, তার কাছে মোট ৪০ বস্তা সার ছিল। এর মধ্যে ৩০ বস্তা ডিএপি ও ১০ বস্তা টিএসপি থাকলেও ইউরিয়া ছিল না। কৃষকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় নির্ধারিত পরিমাণে সার দেওয়া সম্ভব হয়নি। তার দাবি, প্রায় ২০০ কৃষক সেদিন সার না পেয়ে ফিরে গেছেন।

কৃষকরা জানান, তাদের জমির প্রয়োজন অনুযায়ী ইউরিয়া ও ডিএপি প্রয়োজন হলেও অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে টিএসপি দেওয়া হচ্ছে। এতে চাষাবাদে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ সার প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না।

সাত বিঘা জমিতে ধান ও এক বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করা রাশেদা বেগম বলেন, তার প্রয়োজন ছিল ইউরিয়া ও ডিএপি। কিন্তু তিনি মাত্র এক বস্তা টিএসপি পেয়েছেন। একই অভিযোগ করেন ধান ও বেগুন চাষি নুরুজ্জামান ও নুরুদ্দিন।

অন্যদিকে, বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নের কয়েকজন কৃষকের অভিযোগ, ডিলারের সঙ্গে পরিচিত বা ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা তুলনামূলকভাবে সহজে সার পাচ্ছেন। তবে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ডিলার প্রতিনিধি আবুল হাশেম জানান, সম্প্রতি তারা ২৭২ বস্তা ডিএপি, ১৭৮ বস্তা এমওপি, ৬০ বস্তা ইউরিয়া ও ৯৫ বস্তা টিএসপি পেয়েছেন। এসব সার ওয়ার্ড পর্যায়ের খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। সরবরাহ কম থাকায় ইউরিয়ার একটি অংশ পরে দেওয়ার জন্য রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তার দাবি, দুধকুমার নদের চরে বিপুল পরিমাণ জমিতে বেগুন চাষ হওয়ায় ওই এলাকায় সারের চাহিদা অনেক বেশি। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম।

চাহিদা ও বরাদ্দে বড় ব্যবধান কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি খরিপ-২ মৌসুমে জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। পাশাপাশি ২ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, আমন, বেগুন, ফুলকপি ও বাঁধাকপির জন্য জেলায় মোট ইউরিয়া সারের প্রয়োজন প্রায় ২৩ হাজার ৭৮৪ টন। বিপরীতে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১২ হাজার ৪৮৩ টন।

একই সময়ে টিএসপির চাহিদা প্রায় ৬ হাজার ১৬৪ টন হলেও বরাদ্দ পাওয়া গেছে ২ হাজার ১০৪ টন। আর ডিএপির চাহিদা ১০ হাজার ৯০৫ টন হলেও বরাদ্দ মিলেছে ৫ হাজার ৬৭ টন।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ডিএপি ব্যবহারের ফলে টিএসপির প্রয়োজন কমে এবং ইউরিয়ার চাহিদাও কিছুটা কমতে পারে। তবে মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত ইউরিয়া না থাকায় কৃষকদের কেউ কেউ ডিএপিকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছেন।

ভূরুঙ্গামারীর দুধকুমার নদের তীরবর্তী গনাইয়ের কুটি চরে গিয়ে দেখা যায়, বিপুলসংখ্যক কৃষক বেগুনের খেতে কাজ করছেন। কয়েকজন কৃষক জানান, প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার না পেয়ে তারা জৈব সার ও ম্যাগনেসিয়াম ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ ইউরিয়ার পরিবর্তে ডিএপি ব্যবহার করছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, কোন ফসলে কী পরিমাণ সার প্রয়োগ করতে হবে, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শও তারা নিয়মিত পাচ্ছেন না।

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমন মৌসুমে জমিতে আগের ফসলের অবশিষ্ট উর্বরতার কারণে অতিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগের প্রয়োজন সব ক্ষেত্রে হয় না। নিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণেও কিছু জমিতে বাড়তি সার প্রয়োজন নাও হতে পারে।

তিনি বলেন, ভূরুঙ্গামারীতে খরিপ-২ ও রবি মৌসুমে আগাম বেগুনের ব্যাপক আবাদ হওয়ায় নিয়মিত বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত ৬০০ টন সার চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, জনবল সংকট থাকায় প্রত্যেক কৃষকের জমিতে সরাসরি গিয়ে পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

আজকালের কন্ঠ/আর বি

প্রিন্ট করুন