লক্ষ্মীরের কমলনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরাফাত হুসাইনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি। ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণ করতে পারলে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন এই কর্মকর্তা।
সম্প্রতি কমলনগর উপজেলা ভূমি অফিসে নামজারি সংক্রান্ত একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে কয়েকজন ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে চাপ প্রয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ করেন এসি ল্যান্ড। এ ঘটনায় উপজেলা ভূমি অফিসের পক্ষ থেকেও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় কমলনগর উপজেলা ভূমি অফিসের সরকারি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক প্রতিবাদলিপিতে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাতে একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিও কনটেন্টকে ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলে দাবি করা হয়।
এসি ল্যান্ড আরাফাত হুসাইন জানান, ১৯৯৬ সালের একটি দলিলের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে একটি নামজারি সম্পন্ন হয়। ওই দলিলে দুটি দাগ উল্লেখ থাকলেও দাতা বাস্তবে একটি দাগের জমির মালিক ছিলেন না। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে তৎকালীন এসি ল্যান্ড মালিকানাসংক্রান্ত বিষয় বিবেচনায় নিয়ে একটি দাগের জমি নামজারি করেন।
তাঁর ভাষ্য, দলিলের দাতা ও গ্রহীতা দুজনই বর্তমানে জীবিত। দলিলে উল্লেখিত জমির ভিত্তিতে নামজারি করতে হলে সংশ্লিষ্ট দলিল সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী নামজারি মামলা দায়ের করতে হবে।
আরাফাত হুসাইন বলেন, নামজারি করা বা বাতিল—দুটিই আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয়। কোনো পক্ষ সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে আপিলসহ প্রচলিত আইনে প্রতিকার নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তাঁর অভিযোগ, আইনি প্রক্রিয়ার পরিবর্তে কয়েকজন ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে তাঁর কার্যালয়ে এসে নামজারি করে দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন।
তিনি বলেন, “নামজারি মামলা অথবা নামজারি বাতিলের মামলা পুরোপুরি আইনি বিষয়। কোনো ব্যক্তি রায়ে অসন্তুষ্ট হলে আপিল করতে হবে। কিন্তু এখানে এসে সাংবাদিক পরিচয়ে মব করে নিজের পক্ষে রায় আদায়ের সুযোগ নেই।”
এদিকে তাঁকে ঘিরে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের বিষয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন এসি ল্যান্ড। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের জন্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, “ঘুষ নিয়েছি প্রমাণ করতে পারলে চাকরি ছেড়ে দেব।”
অন্যদিকে ‘বীর চট্টলা টিভি’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ১৫ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে কয়েকজন ব্যক্তিকে এসি ল্যান্ডের কার্যালয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। ভিডিওতে একটি টেবিলের ওপর কয়েকটি বুমও দেখা যায়। এ সময় একজন ব্যক্তিকে এসি ল্যান্ডের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখা যায়। ভিডিওটির ভয়েসওভারে সেখানে ৭-৮ জন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নিবন্ধিত আইপি টিভি ও অনলাইন গণমাধ্যমের তালিকায় ‘বীর চট্টলা টিভি’ নামে কোনো নিবন্ধিত আইপি টিভি বা অনলাইন নিউজ পোর্টালের নাম পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে ‘বীরচট্টলাটিভি ডটকম’ নামে একটি ওয়েবসাইটের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ওয়েবসাইটটির ফুটারে চেয়ারম্যান, কো-চেয়ারম্যান ও উপদেষ্টা হিসেবে কয়েকজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে তাঁরা বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কীভাবে যুক্ত এবং তাঁদের সম্মতিতে নামগুলো ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কমলনগর প্রেসক্লাবের সভাপতি ইউছুফ আলী মিঠু বলেন, একটি মহল নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিচিত ও গুণী ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “উপদেষ্টা হিসেবে যাদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, তারা এসব বিষয়ে আদৌ অবগত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আমরা এ ধরনের অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানাব।”
সাংবাদিক পরিচয়ে সরকারি দপ্তরে গিয়ে কর্মকর্তার ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনায় পেশাদার সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি ও সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকৃত সাংবাদিক পরিচয়, কথিত গণমাধ্যমের বৈধতা, সরকারি কর্মকর্তার ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ এবং এসি ল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষের অভিযোগ—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে যাচাই ও তদন্তের দাবি উঠেছে।
আজকালের কন্ঠ/আর বি