Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ , ৩:৩২ অপরাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ আগস্ট ২৩, ২০২৬ , ৮:২৯ অপরাহ্ণ

এলজিইডিতে পদোন্নতি-বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ, শফিকুর রহমানকে ঘিরে প্রশ্ন

লেখকঃ নিজস্ব প্রতিবেদক

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রশাসনিক কার্যক্রমে পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন ও নিয়োগকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেধা, জ্যেষ্ঠতা ও প্রচলিত বিধিমালার পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করা হচ্ছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এলজিইডির প্রশাসন শাখার জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকৌশলী শফিকুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে একটি চক্রের মাধ্যমে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন ও নিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব খাটিয়ে আসছেন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে শফিকুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

এলজিইডির সাম্প্রতিক পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রায় ১৯৭ জন সহকারী প্রকৌশলীকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় জনপ্রতি ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত অর্থ না দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পদোন্নতির ফাইলের অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করা হতো। তবে এসব অর্থ লেনদেনের অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

একইভাবে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও প্রায় ১৩৫ কর্মকর্তার কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সার্ভেয়ারদের পদোন্নতিতেও ৪ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বদলি-পদায়নেও ‘রেটকার্ডের’ অভিযোগ

শুধু পদোন্নতি নয়, বদলি ও পদায়ন নিয়েও এলজিইডির ভেতরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, গুরুত্বপূর্ণ বা কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলে পদায়নের জন্য কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগের মধ্যে সাভারে একটি কাঙ্ক্ষিত পদে পদায়নের জন্য প্রায় ১৫ লাখ টাকা এবং জাজিরায় সহকারী প্রকৌশলীর একটি পদে বদলির জন্য ১০ লাখ টাকা লেনদেনের কথাও বলা হয়েছে।

এ ছাড়া বরিশাল সদর থেকে বাবুগঞ্জ উপজেলায় একজন প্রকৌশলীর পদায়নের ক্ষেত্রেও ৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ বা সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নিয়োগ ঘিরেও সমঝোতার অভিযোগ

অভিযোগের পরিধি নিয়োগ কার্যক্রমেও বিস্তৃত। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের দায়িত্বকালে একটি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে প্রায় দেড় কোটি টাকার কথিত সমঝোতার অভিযোগ রয়েছে।

‘আব্দুল ওহাব’ নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে ওই অর্থ লেনদেনের প্রক্রিয়া পরিচালনার অভিযোগও করেছে সূত্রগুলো। কথিত সমঝোতায় ১ কোটি টাকা তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর জন্য, ৩০ লাখ টাকা শফিকুর রহমানের জন্য এবং বাকি অর্থ সংশ্লিষ্ট অন্যদের মধ্যে বণ্টনের পরিকল্পনা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

১২ প্রকৌশলীর পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন

এলজিইডিতে বিধিমালা উপেক্ষা করে ১২ জন প্রকৌশলীকে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, শফিকুর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাইফুল কবির ও কথিত ‘ওহাব সিন্ডিকেটের’ প্রভাবে ওই পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই পদোন্নতির ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অতিরিক্ত প্রায় ৫ কোটি টাকা বেতন-ভাতা হিসেবে ব্যয় হয়েছে। একই সময়ে জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতির প্রত্যাশায় থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সম্পদ অর্জন নিয়েও অভিযোগ

শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে। একাধিক সূত্রের দাবি, প্রশাসনিক ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করে তিনি প্রায় ৩০ কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

এ ছাড়া অর্জিত সম্পদের একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস কিংবা বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট নথি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধেও বিপুল অর্থ ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

পুরোনো তদন্তেও নাম আলোচনায়

এলজিইডির অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এলজিইডির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরে দুর্নীতির তদন্তের সময়ও শফিকুর রহমানের নাম আলোচনায় আসে।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের এপ্রিলে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি তদন্ত দল এলজিইডির বিভিন্ন অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে বলে জানা গেছে।

সাবেক কয়েকজন প্রধান প্রকৌশলী ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের সময় শফিকুর রহমান ও আরও কয়েকজনকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অভিযোগ সামনে আসে বলেও দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

নথি পর্যালোচনা ও তল্লাশির দাবি

অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানে এলজিইডির পুরোনো নথিপত্র পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। ২০১০ সাল থেকে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া এলজিইডির বিভিন্ন কার্যালয়ে তল্লাশি চালানোর কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

তবে এসব অনুসন্ধান ও তল্লাশির পর অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের চূড়ান্ত প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন ও নিয়োগকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

তাদের মতে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং অভিযোগের মাধ্যমে কেউ অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করেছেন কি না—তা নথি ও আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের মাধ্যমে বের করা প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে শফিকুর রহমানের বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য ছাড়াই অভিযোগগুলো তুলে ধরা হলো। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

আজকালের কন্ঠ/আর বি

প্রিন্ট করুন