Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ , ১১:১০ পূর্বাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ আগস্ট ৯, ২০২৬ , ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ

মেঘনার রুপালি ইলিশের দামে আকাশ-পাতাল পার্থক্য, নিয়ন্ত্রণ কার হাতে—প্রশ্ন স্থানীয়দের

লেখকঃ জাকির হোসেন জুয়েল, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি

লক্ষ্মীপুর পদ্মা-মেঘনার মিলনস্থল লক্ষ্মীপুরের বিস্তীর্ণ নদীজুড়ে ইলিশের বিচরণ। জেলার রায়পুর, রামগতি ও কমলনগরের বিভিন্ন ঘাটে মৌসুমে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে রুপালি ইলিশ। ঘাটে মাছ উঠলেও স্থানীয় বাজারে তার প্রভাব খুব একটা নেই। বরং চড়া দামের কারণে সাধারণ ক্রেতাদের অনেকের নাগালের বাইরে চলে গেছে জাতীয় মাছ ইলিশ।

নদীর কাছাকাছি বসবাস করেও স্থানীয় মানুষের ইলিশ কিনতে এমন দুর্ভোগ কেন—এ প্রশ্ন এখন ঘুরছে জেলার বিভিন্ন বাজারে। জেলে, আড়তদার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে ইলিশের দাম কীভাবে কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে, তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।

জেলেদের আয় কম, ভোক্তার খরচ বেশি

স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীতে মাছ পাওয়ার পরও সবটুকু লাভ তাদের হাতে থাকে না। নৌকা, জাল, জ্বালানি, শ্রমিক ও খাবারের পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। এর বাইরে অনেক জেলেকে মৌসুমের শুরুতেই দাদনের টাকা নিতে হয়।
ফলে মাছ ধরার পর নির্ধারিত ক্রেতার কাছেই মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জেলেদের দাবি, ঘাটে যে দামে মাছ বিক্রি করেন, বাজারে গিয়ে সেই মাছের দাম কত হয়—তার প্রকৃত হিসাব তাদের কাছেও স্পষ্ট নয়।

এক জেলে বলেন, “আমরা যে দামে মাছ বিক্রি করি, বাজারে গিয়ে সেই মাছের দাম অনেক বেড়ে যায়। মাঝখানে কারা কত লাভ করছে, তা আমরা জানি না।”

ঘাট থেকে বাজার—বাড়ছে দাম

স্থানীয় ক্রেতাদের অভিযোগ, জেলের কাছ থেকে মাছ কেনার পর আড়ত, পাইকারি বাজার ও খুচরা পর্যায়ে একাধিক ধাপ পেরিয়ে ইলিশ ভোক্তার হাতে পৌঁছায়। প্রতিটি ধাপে যুক্ত হয় পরিবহন, বরফ, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ। তবে এসব খরচের বাইরে কোথায় কতটা মূল্য সংযোজন হচ্ছে, তার স্বচ্ছ হিসাব নেই বলে দাবি ক্রেতাদের।

একজন স্থানীয় ক্রেতা বলেন, “ঘাটে যে দামে মাছ বিক্রি হয়, বাজারে এসে সেই মাছের দাম এত বেড়ে যায় কেন—এটা খতিয়ে দেখা দরকার।”

মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

ইলিশের বাজার ব্যবস্থাপনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ ঘাটভিত্তিক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কথা বললেও এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট নথি বা প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করা সম্ভব নয়।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘাট থেকে ভোক্তার পাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে ক্রয়-বিক্রয়ের তথ্য সংরক্ষণ ও প্রকাশ করা গেলে বাজারের প্রকৃত চিত্র সহজেই বেরিয়ে আসবে।

জেলার বাইরে যাচ্ছে কত ইলিশ?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—লক্ষ্মীপুরের নদী ও ঘাটগুলোতে প্রতিদিন যে পরিমাণ ইলিশ উঠছে, তার কত অংশ স্থানীয় বাজারে থাকছে এবং কত অংশ জেলার বাইরে চলে যাচ্ছে?

রায়পুর, রামগতি ও কমলনগরের বিভিন্ন ঘাট থেকে প্রতিদিনের ইলিশের পরিমাণ, ক্রয়মূল্য, পাইকারি মূল্য এবং জেলার বাইরে পাঠানো মাছের পরিমাণের সমন্বিত কোনো তথ্য সাধারণ মানুষের সামনে নেই।

ফলে ইলিশের সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণের প্রকৃত চিত্র নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা প্রশ্ন।

শুধু সিন্ডিকেট নয়, রয়েছে প্রাকৃতিক কারণও

ইলিশের দাম ও প্রাপ্যতা নিয়ে আলোচনায় শুধু বাজার সিন্ডিকেটকে দায়ী করার সুযোগ নেই। নদীর নাব্যতা, ডুবোচর, পানির পরিবেশ, মাছের বিচরণক্ষেত্র পরিবর্তনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত কারণও ইলিশের উৎপাদন ও সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই প্রকৃত কারণ জানতে প্রয়োজন নদী থেকে বাজার পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান।

জেলে ও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় স্বচ্ছতা জরুরি

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন জেলে কত দামে ইলিশ বিক্রি করছেন এবং শেষ পর্যন্ত একজন ভোক্তা কত দামে সেই ইলিশ কিনছেন—এই দুই তথ্যের মধ্যে বিশাল ব্যবধান থাকলে তার কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন।

ঘাটের ক্রয়মূল্য, আড়তের বিক্রয়মূল্য, পাইকারি মূল্য ও খুচরা বাজারের দামের তথ্য নিয়মিত সংরক্ষণ ও প্রকাশ করা গেলে বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কিংবা অনিয়ম থাকলে তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

প্রশ্ন লক্ষ্মীপুরবাসীর

মেঘনার বুক থেকে উঠে আসা ইলিশের বড় একটি অংশ যদি লক্ষ্মীপুরের ঘাট হয়ে দেশের বিভিন্ন বাজারে যায়, তাহলে স্থানীয় বাজারে সেই ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে কেন—এ প্রশ্নের উত্তর চান লক্ষ্মীপুরবাসী।

তাদের দাবি, ইলিশের বাজারে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, জেলে কতটা লাভ পাচ্ছেন এবং ভোক্তা কেন এত বেশি দাম দিচ্ছেন—এসব বিষয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এনে স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

কারণ, যে জেলার নদীতে রুপালি ইলিশ ধরা পড়ে, সেই জেলার সাধারণ মানুষ যদি সেই ইলিশ কিনতেই না পারেন—তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, মেঘনার ইলিশের প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা?

আজকালের কন্ঠ/আর বি

প্রিন্ট করুন