শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আড়ালে একের পর এক অনিয়মের কারবার চলছে রাজধানীর মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ ও নরসিংদীর আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসায়। প্রতিষ্ঠান দুটিতে নিয়োগে বিধি লঙ্ঘন, জাল সনদ, অতিরিক্ত বেতন, ভর্তি নীতিমালা ভঙ্গ, শিক্ষকদের হয়রানি এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিস্তর তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। তদন্ত শেষে প্রতিষ্ঠান দুটি থেকে নানা সুযোগে লুট করা ৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা ফেরত আনার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াসহ শিক্ষার মানোন্নয়নে নানা সুপারিশ করেছে ডিআইএ।
গতকাল সোমবার এই দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।
নিয়মের তোয়াক্কা করেননি মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ, ফেরত দিতে হবে সোয়া ২ কোটি টাকা
১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ ও ফুলপুর ডিগ্রি কলেজে একসঙ্গে চাকরি করেন অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম। মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজে যোগদানকালে ছিল না তার অভিজ্ঞতা। কিন্তু আবেদন বাতিল করে বরং তাকে নিয়োগ দেওয়া বিধিসম্মত হয়নি বলেও মন্তব্য করেছে ডিআইএ। অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পেয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, বিধিবহির্ভূত নিয়োগ, শিক্ষকদের হয়রানি এবং সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে ডিআইএ। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, স্থানীয় এমপি ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানককে করেন কলেজটির সভাপতি। তার ভয় দেখিয়ে তটস্থ রাখতেন শিক্ষকদের। কোনো কিছু হলেই শিক্ষকদের শোকজ করে চাকরি হারানোর ভয় দেখাতেন। করেছেনও তাই। আট শিক্ষককে ১৮বার শোকজ করার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
প্রতিবেদন সূত্র জানায়, অনার্স পরীক্ষার সময় মাওয়া ঘুরতে যান অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হক। এ ছাড়া কলেজটিতে অনুষ্ঠিত অভ্যন্তরীণ ও বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার সম্মানী বণ্টনে ১৪ শতাংশ সম্মানী কেটে রাখতেন তিনি। বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় সম্মানী বণ্টনকালে উৎসকর বাবদ ১২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া মতের অমিল হওয়ায় এমপিওভুক্ত চতুর্থ শ্রেণির দুই কর্মচারীকে জোরপূর্বক অব্যাহতি দেন অধ্যক্ষ আমিনুল। একইভাবে কলেজটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হুমায়ুন কবিরকে বরখাস্ত করা হয়। সেগুলো বিধিসম্মত নয় বলে মত কমিটির। শুধু তাই নয়, ৯ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি লঙ্ঘন করে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কলেজের গাড়ি পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতেন কলেজটির অধ্যক্ষ, যা নীতিমালা পরিপন্থি বলে মন্তব্য করেছে ডিআইএ। এমপিওর পাশাপাশি নিজের মতো করে বেতনও নিয়েছেন তিনি।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক, প্রশাসনিক ও ভর্তি কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। গ্রন্থাগারিক থেকে শিক্ষককে বেতন দেওয়া হয়েছে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই। এর মধ্যে গ্রন্থাগারিকের অতিরিক্ত নেওয়া ৯৬ হাজার টাকা, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অতিরিক্ত দেওয়া ১ কোটি ৯৮ লাখ ৪৫ হাজার ৪৪১ টাকা এবং বিভিন্ন খাতে আদায় করা অর্থ সরকারি কোষাগার ও প্রতিষ্ঠানের তহবিলে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া তিন অর্থবছরের ৮ লাখ ৬৭ হাজার ৬০ টাকা ভ্যাট ও ৪ লাখ ৫ হাজার ৬২ টাকা আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গভর্নিং বডির সদস্যদের সম্মানী থেকে কাটা ৭৬ হাজার ৪৬২ টাকা উৎসে করও জমা দেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, একাদশ শ্রেণিতে বোর্ডের নির্দেশনা ছাড়াই অনলাইন আবেদন ফি আদায়, নির্ধারিত ৫ হাজার টাকার পরিবর্তে ৭ হাজার ৫০০ টাকা ভর্তি ফি নেওয়া, টিউশন ফি নীতিমালার বাইরে বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং কেন্দ্র ফি ও টিসি বাবদ অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন ফি ক্যাশবুকে লিপিবদ্ধ না করা, শিক্ষক নিয়োগে বিধিমালা অনুসরণ না করা, কেনা মাইক্রোবাসের লগবুক ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদন উপস্থাপন না করা এবং স্টক রেজিস্টার সংরক্ষণে অনিয়মের তথ্যও উঠে এসেছে। আগের পরিদর্শন প্রতিবেদনে অতিরিক্ত নেওয়া অর্থ ফেরতের একাধিক সুপারিশও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
পরিদর্শনকালে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে একাধিক অনিয়ম ও ঘাটতি চিহ্নিত হয়েছে। পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে বিশেষ পাঠদানের ব্যবস্থা নেই, নিয়মিত মাসিক শিক্ষক সভা ও বার্ষিক অভিভাবক-সুধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় না। এ ছাড়া বার্ষিক ম্যাগাজিন ও দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ, ছাত্রীদের কমনরুমের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং পর্যাপ্ত ক্রীড়া উপকরণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। স্নাতক (পাস) ও স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সন্তোষজনক নয়, শ্রেণি কার্যক্রমও প্রত্যাশিত মানে পরিচালিত হচ্ছে না। পাশাপাশি ১২ জুন ২০১৮ সালের জনবল কাঠামো অনুযায়ী স্নাতক (পাস) স্তরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষার্থীও নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসার ৭ শিক্ষককে ৮৬ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের মতো নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসায়ও নানা অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে ডিআইএ। এর মধ্যে নিয়োগে অনিয়ম, সার্টিফিকেট জালিয়াতিসহ নানা অসংগতি থাকায় সহকারী শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাককে ৩৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকা, সহকারী গ্রন্থাগারিক নেছার উদ্দিন আহমদকে ২৮ লাখ ৭৩ হাজার টাকা, জুনিয়র শিক্ষক শামসুন্নাহারকে ১১ লাখ ২১ হাজার টাকা, জুনিয়র মৌলভী মানসুরা আক্তারকে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের বেতন এখন থেকে বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্কেলের বাইরে বেতন নেওয়ায় আরবি প্রভাষক জহিরুল হককে ৩ লাখ ২ হাজার টাকা, ইসলামের ইতিহাসের প্রভাষক রফিকুল ইসলামকে ৮৪ হাজার টাকা, কৃষি শিক্ষা শিক্ষক রুহুল আমিনকে ৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে বলা হয়েছে।
এর বাইরে মাদ্রাসাটির ১ দশমিক ৮২ একর জমি বেহাত হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে ডিআইএ। এই জমি কেন বেহাত হলো, তার ব্রডশিট জবাব দিতে বলেছে ডিআইএ। কলেজটিতে আলিম ও ফাজিল স্তর চালু থাকলেও নেই পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী। এ ছাড়া ফাজিল পর্যায়ে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ ও অবকাঠামো নাজুক থাকায় জবাব দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই দুই স্তরে ১১ শিক্ষক-কর্মকর্তার সরকারি বেতন-ভাতা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম ও আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ জহিরুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
আজকালের কন্ঠ/আর বি