Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬ , ২:৩৬ পূর্বাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ জুলাই ৫, ২০২৬ , ২:৪২ অপরাহ্ণ

প্রতিবন্ধকতা জয় করে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার হলে বৈশাখী

লেখকঃ কাজী ইমরান, নড়াইল প্রতিনিধি

জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী বৈশাখী খাতুন (১৮) সে ঠিক মত হাঁটতে পারে না। হাঁটার সময় পা দুইটা হাঁটুর নীচ থেকে বেঁকে যায়। এ জন্য এঁকেবেঁকে চলাফেরা করতে হয় তাকে। দেখলে মনে হয় হাঁটতে গেলেই পড়ে যাবে। এভাবেই নানা প্রতিকূলতায় কেটেছে তার স্কুল-কলেজের শিক্ষাজীবন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা দারিদ্রতা কোনোটিই থামাতে পারেনি বৈশাখী খাতুনকে। সব প্রতিকূলতাকে জয় করে এবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন তিনি।

শারীরিক প্রতিবন্ধী বৈশাখী নড়াইল সদর উপজেলার মাইজপাড়া ইউনিয়নের মাগুরা গ্রামের মো. মন্নু মোল্যা ও ডালিম বেগমের মেয়ে।

পারিবারিক সুত্রে জানা গেছে, জন্মগত শারিরীক প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে ছোটবেলা থেকেই নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে মাইজপাড়া ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। এর আগে মাইজপাড়া কেডিএম মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে বৈশাখী খাতুন।

জানা গেছে, বৈশাখী শুধু শারীরিক প্রতিবন্ধকতারই শিকার নয়, পারিবারিকভাবে অভাব আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত। তাদের সংসার চলে অভাব অনটনের যাঁতাকলের মধ্যে দিয়ে।

বৈশাখীর পিতা মো. মন্নু মোল্যা বলেন, আমার কোনো আবাদি জমি নেই। সমিতি থেকে লোন উঠায়ে ২ শতক জমি কিনিছি। ওই কিস্তির টাকা শোধ করে আবার লোন নিয়ে একটি খুপড়ি ঘর তুলে সেখানে স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে কোনোরকম থাকি। ভ্যান চালায়ে যা ইনকাম হয় তা দিয়ে সংসার চালাই আর সমিতির কিস্তি দি। বৈশাখী পড়াশোনায় খুব ভালো কিন্তু আমি অভাবের তাড়নায় তাকে ভালো করে পড়াতে পারিনা। কিভাবে পড়াব? আমারতো টাকা পয়শা নেই। অভাবের কারনে আমার ছোট ছেলেটাও পড়াশোনা ছাড়ান দেছে। অনেক কষ্ট করে মেয়েটারে এই পর্যন্ত পড়ায়ে আনিছি আমি আর পাইরে দিচ্ছিনে। আমার মেয়েটা একা চলতে পারেনা। কেউ যদি আমার মেয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব নিতো, তাহলে মেয়েটা ভালোভাবে লেখাপড়া করতে পারতো।

কথা হলে বৈশাখী জানান, আমি লেখাপড়া করে শিক্ষক হতে চাই। জীবনে আমার অনেক স্বপ্ন। সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে জীবনে ভালো কিছু একটা করতে চাই। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন।

মা ডালিম বেগম বলেন, আমার মেয়ের পড়াশোনায় খুব আগ্রহ। কিন্তু অভাবের সংসারে তাকে আমরা ভালোভাবে পড়াতে পারিনা। ঠিকমত বইখাতা কিনে দিতে পারিনা। একটা প্রাইভেটও পড়াতে পারিনা। সে নিজে থেকে তার সহপাঠীদের কাছ থেকে বই সংগ্রহ করে আবার কখনও খাতায় নোট করে এনে পড়াশোনা করে। আমরা এমনিতেই অনেক গরিব মানুষ তারপর আবার মেয়েটা শারীরিক প্রতিবন্ধী। যদি সমাজের বিত্তবানরা আমার মেয়ের পড়াশোনায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত তাহলে মেয়েটা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারত।

মাইজপাড়া ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক সূচিন্দনাথ মন্ডল বলেন, বৈশাখী খাতুন মেধাবী ছাত্রী। সে পড়াশোনায় খুব ভাল। বৈশাখী শারীরিক প্রতিবন্ধী ও হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় আমি তাকে কিছু কিছু বইসহ যতটুকু সম্ভব তাকে সহযোগিতার চেষ্টা করি। বৈশাখী যদি সুষ্ঠু পরিবেশ পায় আমার বিশ্বাস তাহলে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।

নড়াইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) টি এম রাহসিন কবির বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বৈশাখী খাতুনকে থামাতে পারেনি। তার সাহস, আত্মবিশ্বাস ও অদম্য মনোবল অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা। উপজেলা প্রশাসন সবসময় তার পাশে থাকবে এবং সে যেন উচ্চশিক্ষা অর্জন করে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে, সেই প্রত্যাশাই কামনা করি।

উল্লেখ্য, এবার এইচএসসি ও আলিম পরিক্ষায় জেলায় মোট ৫ হাজার ৫ শত ৩৩ জন পরিক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে এইচএসসি পরিক্ষায় ২ হাজার ৬৭০ জন ছেলে, ও ২ হাজার ৫৪৩ জন মেয়ে। এবং আলিম পরিক্ষায় অংশ নিয়েছেন ১৬৬ জন ছেলে ও ১৫৪ জন মেয়ে।

আজকালের কন্ঠ/আর বি

প্রিন্ট করুন