পিরোজপুর জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগে (এলজিইডি) কোনো ধরনের ঠিকাদারি কাজ সম্পন্ন না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। বহুল আলোচিত ৬ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের বিশেষ সহযোগী ও তৎকালীন পিরোজপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে’র বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার এই অনিয়ম ও ঘুষবাণিজ্যের প্রমাণ মিলেছে। এই অপরাধে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তিনি এখনো রয়েছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর প্রকৌশলী রঞ্জিত দে-কে পিরোজপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয়। যোগদানের পর থেকেই একটি বিশেষ মহলের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি। পূর্ববর্তী নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারের দুর্নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিশেষ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো কাজ না করা সত্ত্বেও ভুয়া কাগজপত্রে শত শত কোটি টাকার বিল অনুমোদন করেন তিনি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ভান্ডারিয়ার ‘ইফতি ইটিসিএল’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো কাজ না করেই ৮৯ কোটি টাকা বিল প্রদান করেছেন রঞ্জিত দে। এছাড়া নেছারাবাদ উপজেলার শফিক সুমন নামে এক ঠিকাদারকে বেশ কয়েকটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে কোনো কাজ ছাড়াই ১২২ কোটি টাকার বিল পাইয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।
দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মঠবাড়িয়ার বাসিন্দা হরিদাশ হাওলাদার শিপন চলতি বছরের জানুয়ারি ও মার্চ মাসে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী, মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পিরোজপুরে যোগদানের পর গত বছরের ১৪ নভেম্বর রঞ্জিত দে-কে কুড়িগ্রামে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছিল। কিন্তু নানা কৌশলে ২৮ নভেম্বর তিনি সেই আদেশ স্থগিত করান। পরবর্তীতে ৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির আদেশে তাকে পুনরায় বদলি করা হলেও অজ্ঞাত ক্ষমতার বলে তিনি স্বপদে বহাল থাকেন।
চাপে পড়ে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ রঞ্জিত দে-কে পুনরায় সাময়িক বরখাস্ত করলে তিনি অফিসিয়ালি কাউকে কিছু না জানিয়ে রাতের অন্ধকারে পিরোজপুর ত্যাগ করেন। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বরখাস্ত হওয়ার পর অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দীর্ঘদিন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আত্মগোপন করেছিলেন তিনি। তবে কিছুদিন পর গোপনে দেশে ফিরে এসে নিজেকে বিএনপি কর্মী পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন নেতার মাধ্যমে চাকরিতে পুনর্বহালের জোর তদবির শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকায় এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে পুনরায় পিরোজপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে যোগদানের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
রঞ্জিত দে’র এমন নজিরবিহীন দুর্নীতিতে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও নিয়মিত ঠিকাদাররা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নিয়মিত ঠিকাদার বলেন,
“এই ইঞ্জিনিয়ার মহা দুর্নীতিবাজ এবং অফিসে নিয়মিত থাকতেন না। পছন্দের ঠিকাদারদের সঙ্গে আঁতাত করে কাজ না করলেও শত কোটি টাকা বিল দিয়েছেন। অথচ আমাদের বৈধ কাজের মোটা অঙ্কের বিল বকেয়া পড়ে আছে।”
ঠিকাদার মো. মামুন মিয়া বলেন, “নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে সব ধরনের অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। তার বদলির আদেশ হলেও অদৃশ্য শক্তির কারণে তিনি বারবার ফিরে আসেন। আমরা সাধারণ ঠিকাদাররা এখন শঙ্কিত।”
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল্লাহ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কাজ না করেই কোটি কোটি টাকা নিয়ে গেল ঠিকাদার আর ইঞ্জিনিয়ার। এই কাজ আদৌ কোনোদিন হবে কি না আমরা জানি না।”
পিরোজপুরের সাধারণ জনগণ এবং নিয়মিত ঠিকাদাররা এলজিইডির সাবেক এই দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী রঞ্জিত দে-কে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এদিকে এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে’র সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
আজকালের কন্ঠ/আর বি