বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। খাদ্য উৎপাদনে আমাদের সাফল্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধির এই সাফল্যের আড়ালে একটি গভীর সংকট ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের ব্যবহার। ফসলকে রোগবালাই ও পোকামাকড় থেকে রক্ষা করার জন্য ব্যবহৃত কীটনাশক এখন অনেক ক্ষেত্রে কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস, পরিবেশ দূষণ এবং খাদ্যের গুণগত মান নষ্ট করার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাটির উর্বরতার ওপর নীরব আঘাত।
মাটি কেবল খনিজ পদার্থের সমষ্টি নয়; এটি একটি জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা। কোটি কোটি অণুজীব, কেঁচো ও উপকারী জীব মাটির ভেতরে পুষ্টিচক্র সচল রাখে। অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে এসব উপকারী জীব ধ্বংস হয়, জৈব পদার্থের ক্ষয় বাড়ে এবং মাটির স্বাভাবিক জৈবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ফলে মাটির গঠন দুর্বল হয়, পানি ধারণক্ষমতা কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু কীটনাশক মাটিতে দীর্ঘদিন থেকে গিয়ে জীববৈচিত্র্য ও মাটির স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশে নিবিড় সবজি চাষে অর্থনৈতিক চাপ ও অধিক ফলনের আশায় অনেক কৃষক সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক ব্যবহার করেন। এর ফলে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
খাদ্যমান ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি
অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো খাদ্যে রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ (Residue) থেকে যাওয়া। বিভিন্ন গবেষণায় বাংলাদেশের সবজি ও ফলের মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে বেশি কীটনাশক অবশিষ্টাংশ পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
এই অবশিষ্টাংশ মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, লিভার ও কিডনির জটিলতা, হরমোনজনিত সমস্যা এবং স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্যের স্বাদ, পুষ্টিমান ও নিরাপত্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে দেশীয় ভোক্তার স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্যের গ্রহণযোগ্যতাও কমে যায়।
পরিবেশগত ক্ষতি
কীটনাশকের একটি অংশ বৃষ্টির পানি বা সেচের মাধ্যমে নদী, খাল ও ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে যায়। এতে জলজ প্রাণী, মাছ, পরাগায়নকারী মৌমাছি এবং অন্যান্য উপকারী প্রাণীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা শেষ পর্যন্ত কৃষকের জন্যই নতুন সমস্যার জন্ম দেয়। কেন বাড়ছে অতিরিক্ত ব্যবহার?
কৃষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব। দ্রুত ফলন পাওয়ার মানসিকতা।কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের অনিয়ন্ত্রিত পরামর্শ।কীটনাশক ব্যবহারের নিয়ম ও অপেক্ষাকাল সম্পর্কে অজ্ঞতা।মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত তদারকি ও মনিটরিংয়ের ঘাটতি।সমাধানের পথ সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ রাসায়নিকের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে জৈবিক নিয়ন্ত্রণ, ফেরোমন ফাঁদ, আলোকফাঁদ এবং প্রতিরোধী জাত ব্যবহারের মাধ্যমে বালাই দমন করতে হবে। এটি বিশ্বের বহু দেশে সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে ।জৈব ও বায়োপেস্টিসাইডের ব্যবহার বৃদ্ধি ।নিমভিত্তিক ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব বায়োপেস্টিসাইড ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। এতে মাটির স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত থাকবে।
কৃষক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা প্রতিটি উপজেলায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে সঠিক মাত্রা, সময় ও পদ্ধতিতে কীটনাশক ব্যবহারের জ্ঞান পৌঁছে দিতে হবে। অবশিষ্টাংশ পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার বাজারজাত ফল ও সবজিতে নিয়মিত রেসিডিউ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে আধুনিক পরীক্ষাগার ও নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার
জৈব সার, কম্পোস্ট, সবুজ সার এবং ফসল পর্যায়ক্রমিক চাষ (Crop Rotation) বাড়িয়ে মাটির জৈব পদার্থ ও অণুজীবের কার্যকারিতা পুনরুদ্ধার করতে হবে।
কঠোর নীতি ও বাস্তবায়ন
নিষিদ্ধ বা উচ্চঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশকের বিক্রি ও ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জাতীয় পুরুস্কার প্রাপ্ত কৃষি উদ্যোক্তা কাজী আনিছুর রহমান , দশমিনা পটুয়াখালী ,থেকে বলেন* :দীর্ঘ মেয়াদি কীটনাশক ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা হ্রাস পায় সাথে প্রাকৃতিক খাদ্যমান কমে যায় জীব ও বৈচিত্র্যে প্রভাব পরে এ থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে জৈব সার, ভার্মি কম্পোস্ট সার ব্যবহার বৃদ্ধি করার কথা জানান এতে করে মাটির গুণাগুণ ও খাদ্যমান ঠিক থাকে।
কৃষিবিদ:মোঃ জাফর আহমেদ উপজেলা কৃষি অফিসার দশমিনা, পটুয়াখালী থেকে বলেন, উত্তম কৃষি চর্চা পদ্ধতিতে ফসল আবাদ বৃদ্ধি করা হলে কীটনাশকের ব্যবহার কমবে। একই সাথে বায়োপেস্টিসাইডের ব্যবহার বৃদ্ধি ও পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে এই ঝুকিমুক্ত হওয়া যাবে।
খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই উৎপাদন যদি মাটির উর্বরতা ধ্বংস করে, খাদ্যকে অনিরাপদ করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কৃষিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়, তবে তা কখনোই টেকসই উন্নয়ন নয়। আজকের অতিরিক্ত কীটনাশক আগামী দিনের খাদ্যসংকটের বীজ বপন করছে। তাই উৎপাদনের পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য, সুস্থ মাটি এবং পরিবেশবান্ধব কৃষিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষক, নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং ভোক্তা—সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই গড়ে উঠতে পারে নিরাপদ ও টেকসই
আজকালের কন্ঠ/আর বি