Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ , ৩:৩৩ অপরাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ জুন ৭, ২০২৬ , ৫:২৩ অপরাহ্ণ

নবান্নে ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি

লেখকঃ প্রফেসর ড. আসিফ মিজান

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যে ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটে গেছে, তা কেবল একটি রাজ্যের ক্ষমতার রদবদল নয়; বরং সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি এবং বিশেষ করে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক সুদূরপ্রসারী জলবিভাজক। দীর্ঘ দেড় দশকের (১৫ বছর) একচ্ছত্র শাসনের পর অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মহীরুহসম রাজনৈতিক দুর্গের পতন ঘটেছে। উগ্র জনমোহিনী নীতি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ এবং ‘বাঙালি অস্মিতা’র তাস খেলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ২৯৪টি আসনের মধ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০৭টি আসনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করেছে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৮০টি আসনে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। খোদ ভবানীপুর কেন্দ্রে নিজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা থেকে চরম প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হওয়া শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫,১০৫ ভোটের ব্যবধানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত পরাজয় এই পতনের গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

গত প্রায় অর্ধশতকের মধ্যে এই প্রথম ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় থাকা কোনো রাজনৈতিক দল একই সাথে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিল। গণতান্ত্রিক চক্রে দীর্ঘমেয়াদি শাসনের অবসান নতুন কিছু নয়, তবে এই পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাব এখন পড়তে শুরু করেছে অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামো, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক ক্যালকুলেশনে।

জোড়াফুলের অন্তর্ধান ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহঃ
এই নির্বাচনি বিপর্যয় কেবল নবান্ন থেকে মমতার বিদায়ঘণ্টাই বাজায়নি, বরং তাঁর নিজের হাতে গড়া দল তৃণমূল কংগ্রেসকে এক নজিরবিহীন অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছে। ভোটের ফলাফল প্রকাশের মাত্র এক মাসের মাথায় দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জনই প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। নবনির্বাচিত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছে। বিধানসভার স্পিকার ইতিমধ্যেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, যা দলের ওপর সুপ্রিমো মমতার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে। মমতা চেয়েছিলেন প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করতে, কিন্তু তাঁর পক্ষে মাত্র ২০ জন বিধায়কের সমর্থন ছিল। ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে তাঁর ডাকা প্রতিবাদ কর্মসূচিতে মাত্র ৮ জন বিধায়কের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, রাজকীয় অহংকারের পতনের পর আঞ্চলিক রাজনীতিতে তিনি কতটা একাকী ও কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।

পতনের সমাজতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক কার্যকারণঃ

আন্তর্জাতিক রাজনীতির তুলনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে মমতার এই পতনের পেছনে চারটি প্রধান কাঠামোগত নিয়ামক কাজ করেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও ‘কাট-মানি’ সংস্কৃতি:
শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে রেশন দুর্নীতি এবং তৃণমূলের তৃণমূল স্তরের নেতাদের সীমাহীন অর্থলিপ্সা ও ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি পলিটিক্স’ সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। নীতিহীন রাজনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক চুরির চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে দলটিকে।

আর জি কর কাণ্ড ও মধ্যবিত্তের মোহভঙ্গ:
কলকাতার আর জি কর মেডিকেল কলেজে তরুণী চিকিৎসকের ওপর নৃশংস নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এবং তা ধামাচাপা দেওয়ার সরকারি অপচেষ্টা পশ্চিমবঙ্গের সুশীল সমাজ, যুবসমাজ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে পুরোপুরি ক্ষুব্ধ করে তোলে। যে নারী ভোটব্যাংক মমতার প্রধান শক্তি ছিল, তা এই একটি ঘটনায় সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে চলে যায়।

বিজেপির হিন্দু ভোট একীকরণ:
নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের সুনির্দিষ্ট নির্বাচনি কৌশল উত্তরবঙ্গ, জंगलমহল এবং সীমান্ত জেলাগুলোতে সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটের এক অভূতপূর্ব মেরুকরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। বামপন্থী ও কংগ্রেসের ভোটব্যাংক প্রায় শূন্যে নেমে এসে সরাসরি বিজেপির ঝুলিতে পড়া এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান অনুঘটক।

ভোটার তালিকার সংস্কার:
নির্বাচনের আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR)-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা পরিমার্জন এবং মুসলিম প্রধান জেলাগুলোতে (যেমন মুর্শিদাবাদে তৃণমূলের আসন ২০ থেকে ৯-এ নেমে আসা) ভোটের নতুন মেরুকরণ এই ফলাফলের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশের ওপর প্রভাব: তিস্তা ও ভূরাজনীতিঃ
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভৌগোলিক নৈকট্য, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং অভিন্ন সাংস্কৃতিক সংযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের (বিজেপি) ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার প্রতিষ্ঠার ফলে ঢাকার ফরেন পলিসিতে কিছু নতুন সমীকরণ যুক্ত হতে যাচ্ছে:

পানি বণ্টন ও অমীমাংসিত দ্বিপাক্ষিক ইস্যু:
দীর্ঘ এক দশক ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একগুঁয়েমির কারণে ঝুলে থাকা তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নের পথ তাত্ত্বিকভাবে এখন কিছুটা মসৃণ হতে পারে। কেন্দ্রের মোদী সরকারের সঙ্গে ঢাকার তিস্তা চুক্তি সম্পাদনে এখন আর কলকাতার কোনো ‘আঞ্চলিক ভেটো’ বা রাজনৈতিক বাধা থাকছে না। তবে পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা এবং বিজেপির নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের কারণে তিস্তার জল জলপাইগুড়ি বা শিলিগুড়ি থেকে বাংলাদেশের দিকে কতটা প্রবাহিত হবে, তা দিল্লির রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে।

সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অভিবাসন ও নিরাপত্তা:
বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল ‘অনুপ্রবেশ’ রোধ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা। ফলে, বর্ডার ম্যানেজমেন্ট বা সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বিএসএফ (BSF)-এর কড়াকড়ি আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় নাগরিকত্ব আইন (CAA) ও এনআরসি (NRC) বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত হতে পারে। এর ফলে দ্বিপাক্ষিক সীমান্তে সাময়িক উত্তেজনা বা সীমান্ত বাণিজ্যে নতুন শুল্ক নীতি ও কড়াকড়ির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে অর্থনৈতিক করিডোর ও ট্রানজিট সুবিধার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।

সাংস্কৃতিক সংযোগ ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব:
বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন দুই অঞ্চলের মানুষকে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত করে রেখেছে। তবে ক্ষমতার এই রূপান্তরের পর সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে নীতিগত সহনশীলতা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক বয়ান যেন দুই বাংলার দীর্ঘদিনের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সৌহার্দ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সেদিকে উভয় দেশের নীতিনির্ধারকদের সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। কলকাতার নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক যোগাযোগে নতুন কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।

ইতিহাসের অমোঘ শিক্ষাঃ
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই পরিবর্তন ইতিহাসের এক অমোঘ সত্যকে পুনরুত্থিত করে—গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনবিচ্ছিন্নতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং অহংকার কখনো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার গ্যারান্টি হতে পারে না। অতীতে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে মমতা যেভাবে উল্কাবেগে এসেছিলেন, ঠিক একইভাবে দুর্নীতির চোরাবালিতে আটকে আজ তাঁর নিজের তৈরি করা সাম্রাজ্যই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। ওপার বাংলার এই পটপরিবর্তন এপার বাংলার রাজনীতি, প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের জন্যও এক বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত বার্তা বহন করে। পরিবর্তিত এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলকে অত্যন্ত বিচক্ষণতা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং কৌশলগত দূরদর্শিতার সাথে দিল্লির পাশাপাশি নবান্নের নতুন নীতিনির্ধারকদের সাথে কার্যকর বোঝাপড়া গড়ে তুলতে হবে।

লেখক: ভিসি, ডিএসইউ, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

প্রিন্ট করুন