Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ , ৭:৩৫ পূর্বাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ জুন ৫, ২০২৬ , ৪:০৫ অপরাহ্ণ

বিশ্ব পরিবেশ দিবস বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা

লেখকঃ মোঃ ইসতিয়াক আহম্মদ আসিফ, গোবিপ্রবি প্রতিনিধি

প্রকৃতি ও পরিবেশ মানুষের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশুদ্ধ বায়ু, নিরাপদ পানি, উর্বর মাটি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভর করেই টিকে আছে পৃথিবীর প্রাণপ্রবাহ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, দূষণ ও পরিবেশ ধ্বংসের নানা কর্মকাণ্ড আজ বৈশ্বিক সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রতি বছর ৫ জুন পালিত হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস, যা পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানায়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা সমাজের সচেতন ও সম্ভাবনাময় একটি অংশ; পরিবেশ রক্ষায় তাদের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও অংশগ্রহণ ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে আরও বাসযোগ্য করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, সবুজ ক্যাম্পাস, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা, প্রত্যাশা এবং করণীয় দিকগুলো তুলে ধরেছেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাস সাংবাদিক মোঃ ইসতিয়াক আহম্মদ আসিফ।

১. পরিবেশের যত্ন নিলেই আমাদের দেশ সমৃদ্ধ হবে

আমরা সবাই একটি সুন্দর, নিরাপদ ও উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আমাদের পরিবেশকে রক্ষা করা খুবই জরুরি। কারণ পরিবেশ ভালো থাকলে মানুষ সুস্থ থাকবে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতিও অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত গরম, নদী ও খাল দূষণ, এবং নির্বিচারে গাছ কাটার মতো সমস্যাগুলো আমাদের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তাই শুধু সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে হবে না, আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে। ছোট ছোট কাজ—যেমন গাছ লাগানো, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, ময়লা-আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা এবং পানির অপচয় রোধ করা—পরিবেশ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একজন সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি শুধু প্রকৃতির নয়, এটি সামাজিক দায়িত্ববোধেরও একটি অংশ। আমরা যদি প্রকৃতিকে ভালোবাসি এবং তার যত্ন নিই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ রেখে যেতে পারব। পরিবেশ বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, আর মানুষ বাঁচলেই দেশ এগিয়ে যাবে। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে পরিবেশের যত্ন নিই এবং একটি সবুজ, সুন্দর ও মহান বাংলাদেশ গড়ে তুলি।

আফিফা আক্তার
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

২. প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস হোক সবুজে মোড়ানো

প্রতিবছর ৫ই জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস, আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে পরিবেশ সংরক্ষণ শুধু রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সবার নৈতিক দায়বদ্ধতা। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র নয়, বরং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও সচেতন নাগরিক তৈরির অন্যতম ক্ষেত্র। তাই প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই পরিবেশের আদর্শ মডেল হিসেবে গড়ে তোলা সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে আমার বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ) একটি অনুকরণীয় উদাহরণ হতে পারে। বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ‘গ্রীন ক্যাম্পাস’ হিসেবে সাভারের বিরুলিয়ায় অবস্থিত ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটির প্রায় ৩৬০ একর জমিজুড়ে বিস্তৃত এই ক্যাম্পাসে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, বিস্তৃত সবুজায়ন, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সফল সমন্বয় ঘটেছে। এটাকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিবেশ-সচেতন উন্নয়নের একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত বলে মনে করি। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি সবুজ ক্যাম্পাস শুধু পরিবেশ রক্ষায় নয়, সুস্থ, নিরাপদ ও প্রাণবন্ত শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকটময় সময়ে আমাদের অঙ্গীকার হোক—প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস হবে সবুজে মোড়ানো, টেকসই এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার কেন্দ্রবিন্দু।

রাইয়ান রহমান রিয়াদ
শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

৩. জলবায়ু সংকট: এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়

জলবায়ুর রহস্যময় ও বৈরী আচরণ আজ মানবসভ্যতার জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি শুধু প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবর্তন নয়; বরং মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং পরিবেশের ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে। বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তীব্র তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও খরার মতো দুর্যোগ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এই সংকটের পেছনে প্রধানত দায়ী অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, শিল্পকারখানা ও যানবাহন থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাস, নির্বিচারে বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পরিবেশ দূষণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এর প্রভাব দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। জলবায়ু সংকট মোকাবেলা কোনো একক মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি একটি সমগ্র জাতির যুদ্ধ। এ সংকট মোকাবেলায় পরিবেশ সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতে হবে। শিল্প ও নগরায়ণের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব নীতি অনুসরণ করতে হবে এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার, জলাশয় সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগ, দায়িত্বশীল আচরণ এবং পরিবেশবান্ধব জীবনচর্চার মাধ্যমেই আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সবুজ, টেকসই ও সমৃদ্ধ পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি।

সাবিকুন্নাহার আঁখি
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

৪. আসুন এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলি

পরিবেশ রক্ষা আজ শুধু একটি সচেতনতামূলক বিষয় নয়, বরং মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে এর প্রভাব পড়ে মানুষের জীবন, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে আমাদের প্রত্যেকের সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা জরুরি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে (সূরা আর-রূম ৪১) আবার তিনি সতর্ক করে বলেন, তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না (সূরা আল-আ‘রাফ ৫৬)। এই নির্দেশনা আমাদের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম চাইলে বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের ছোট ছোট সচেতন উদ্যোগই আগামী পৃথিবীকে আরও সবুজ, সুন্দর ও নিরাপদ করে তুলতে সক্ষম। তাই আসুন, আমরা সবাই পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার করি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য, টেকসই ও সমৃদ্ধ পৃথিবী গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করি।

মোঃ আবু সাঈদ
শিক্ষার্থী, আল হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়।

৫. বৃক্ষরোপণ ও জীববৈচিত্র্যেই বাঁচাবে পরিবেশ

তীব্র তাপদাহ আর জলবায়ুর চরম ভাবাপন্নতা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে প্রকৃতি আর ভালো নেই। এই সংকট থেকে বাঁচতে দেশের তরুণ ও শিক্ষার্থী সমাজের এখন একটাই দাবি—ব্যাপক বৃক্ষরোপণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ। আমার মতে, নির্বিচারে গাছ কাটা ও প্লাস্টিক দূষণের ফলে প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে প্রকৃতির ভারসাম্য। একটি গাছ ধ্বংস হওয়া মানে শুধু অক্সিজেন কমে যাওয়া নয়, বরং একটি অবলা জীবের বাসস্থান হারানো। জীববৈচিত্র্যের এই ক্ষতি শেষ পর্যন্ত মানুষের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলছে। এই পরিস্থিতি বদলাতে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে বছরে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর ও তা বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব নিতে হবে। আজ আমরা সচেতন না হলে আগামী দিনের পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। আসুন, কেবল স্লোগানে নয়, আমাদের প্রতিদিনের যাপনে পরিবেশকে রক্ষা করি।

লাবিবা তাসফিয়া
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

৬. প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসাই হোক ভবিষ্যতের অঙ্গীকার

প্রকৃতি কখনো আমাদের কাছে কিছু চায় না, অথচ অকৃপণ হাতে দিয়ে যায় জীবনের সব উপকরণ। ভোরের নির্মল বাতাস, পাখির কলতান, নদীর স্রোতধারা কিংবা বৃক্ষের শীতল ছায়া সবই প্রকৃতির নিঃস্বার্থ উপহার। কিন্তু আধুনিকতার মোহে আমরা দিন দিন প্রকৃতির কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, দূষণ এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে আজ প্রকৃতি যেন নীরবে তার ক্ষতচিহ্ন বহন করছে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের সেই নীরব আর্তনাদ শুনতে শেখায়। এটি মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সঙ্গে বিরোধ নয়, বরং সহাবস্থানই মানব সভ্যতার টিকে থাকার একমাত্র পথ। তাই আসুন, আমরা প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখি, পরিবেশ রক্ষাকে দায়িত্ব নয় অভ্যাসে পরিণত করি। কারণ আজ আমরা যে পৃথিবীর যত্ন নেব, আগামী প্রজন্ম সেই পৃথিবীতেই তাদের স্বপ্নের ঠিকানা খুঁজে পাবে।

ফারদিন মোহাম্মদ
শিক্ষার্থী, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক:
মোঃ ইসতিয়াক আহম্মদ আসিফ,
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ – ৮১০৫
মোবাইল: 01947449532
Email: istiakahammodasif@gmail.com

আজকালের কন্ঠ/আর বি

প্রিন্ট করুন