Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ , ১১:২০ পূর্বাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ জুন ৫, ২০২৬ , ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ

জলবায়ু সচেতনতা ও ভবিষ্যতের পৃথিবী: বিশ্ব পরিবেশ দিবসের অঙ্গীকার

লেখকঃ আদিত্য চৌধূরী

বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। উপকূলীয় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘন ঘন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট এখন এ দেশের লাখো মানুষের নিত্যদিনের সমস্যা। সেইসাথে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, পরিবেশ উদ্বাস্তুর সংখ্যা বাড়ছে। এই বাস্তবতায় জলবায়ু কার্যক্রম বাংলাদেশের জন্য তুচ্ছ কোনো বিষয় নয়, বরং মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের বৈশ্বিক আয়োজনের কেন্দ্রস্থল এবার আজারবাইজানের রাজধানী বাকু। ২০২৪ সালে সফলভাবে কপ-২৯ (COP29) আয়োজন করার পর আজারবাইজান এখন তাদের অর্থনীতিকে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ধাবিত করার মাধ্যমে বিশ্বের সামনে একটি মডেল তৈরি করছে। আজারবাইজান সরকার এই দিবস উপলক্ষে দেশব্যাপী কোটি কোটি গাছ রোপণ এবং ‘জিরো ওয়েস্ট’ উদ্যোগের প্রচার শুরু করেছে। এছাড়া, কাস্পিয়ান সাগরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। দেশটির রয়েছে উপক্রান্তীয় বনাঞ্চল, পাহাড়ি অঞ্চল ও বিচিত্র জীববৈচিত্র্য। এ বছরের স্লোগানটিও বিশেষ অর্থবহ — “Inspired by Nature, For Climate, For Our Future” — যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়; প্রকৃতি থেকে প্রেরণা নিয়ে, জলবায়ুর জন্য এবং আমাদের ভবিষ্যতের জন্য কাজ করতে হবে।

১৯৭২ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে স্টকহোম সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭৩ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ জুন দিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে ১৫০টিরও বেশি দেশ এই দিবসটি উদযাপন করে, যা একে পরিবেশ সচেতনতার সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনে পরিণত করেছে।

বন ও পরিবেশ বিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা প্রতিদিনই দেখি — কীভাবে মানুষের কার্যক্রম বনভূমি ধ্বংস করছে, কীভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং কীভাবে বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO)-র ২০২৫ সালের জলবায়ু প্রতিবেদন নিশ্চিত করেছে যে ২০১৫ থেকে ২০২৫, এই ১১ বছরের রেকর্ড ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণতম। ২০২৫ সাল শিল্পায়ন-পূর্ব গড়ের চেয়ে প্রায় ১.৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রা নিয়ে দ্বিতীয় বা তৃতীয় উষ্ণতম বছর হিসেবে স্থান পেয়েছে। শিল্পায়নের বিস্তার, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং নির্বিচারে বন উজাড় এই সংকটকে ত্বরান্বিত করছে।

Germanwatch-এর “জলবায়ু ঝুঁকি সূচক ২০২৫” অনুযায়ী, প্রতি বছর বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও তাপপ্রবাহে বাংলাদেশের গড় ক্ষতি প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার এবং প্রতি বছর ৬৩ লাখেরও বেশি মানুষ এসব দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের ১১ শতাংশ ভূমি হারিয়ে যাবে এবং শুধু সমুদ্রের কারণেই প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। Global Forest Watch-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ ৪৬ হাজার হেক্টর বনভূমি হারিয়ে গেছে, যা আগের তুলনায় ১৩ শতাংশ হ্রাস। বর্তমানে দেশের মোট আয়তনের মাত্র ১৫.৫৮ শতাংশ বনভূমি, অথচ পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য প্রয়োজন কমপক্ষে ২৫ শতাংশ।

পাহাড়ের দিকে যদি তাকাই, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের মোট ভূমির মাত্র ৮ শতাংশ হলেও দেশের মোট বনভূমির প্রায় ৪০ শতাংশ এখানে অবস্থিত। কাপ্তাই হ্রদের জল আছে, কিন্তু কতদিন? পাহাড় কাটলে পানি থাকে না, পানি না থাকলে জীবন থাকে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি পাহাড় এক-একটি জলাধার। সেটা ধ্বংস করা মানে নিজের তৃষ্ণাকেই আমন্ত্রণ জানানো। আমরা পাহাড়ে বেড়াতে যাই সুন্দর দেখতে; কিন্তু সেই সুন্দর টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব কি আমরা নিচ্ছি? তাই বন কাটা মানে শুধু গাছ হারানো নয়, সেইসাথে কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরীর মতো নদীর মৃত্যুকে ডেকে আনা। পার্বত্য চট্টগ্রামের অরণ্য শুধু গাছের সমাহার নয়, এটি এই অঞ্চলের বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের সংস্কৃতি, জ্ঞান ও জীবনের ধারক। পাহাড়ের ঢাল থেকে মাটি সরে গেলে কেবল ভূমিধস হয় না, সরে যায় মানুষের স্বপ্নও। এর জীববৈচিত্র্য বাংলাদেশের মোট বনভূমির এক অনন্য সম্পদ।

সংকটের মাঝেও আশার কথা হলো, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে, সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারিত হচ্ছে, বনভূমি পুনরুদ্ধারে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা প্রায় ৪,৫০০ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে এবং ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বৈশ্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লাকে ছাড়িয়ে গেছে। স্বাগতিক আজারবাইজানও ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ৪০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

পৃথিবী কারো জন্য অপেক্ষা করে না। এটি প্রতিনিয়ত তার সংকেত পাঠাচ্ছে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। জলবায়ু কার্যক্রম শুধু একটি প্রতিপাদ্য নয়, বরং মানবজাতির প্রতি একটি জরুরি আহ্বান। পরিবেশ সুরক্ষা মানে শুধু প্রকৃতিকে রক্ষা করা নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।

আজকালের কন্ঠ/আর বি

প্রিন্ট করুন