রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের কাচনা এলাকায় তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সেচ ক্যানেল নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষক ও এলাকাবাসীর দাবি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, কম পুরুত্বে ঢালাই এবং যথাযথ তদারকির অভাবে পুরো প্রকল্পের কাজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে ক্যানেলটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে শুরু থেকেই কাজের মান নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে।
সরেজমিনে এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ক্যানেলের বিভিন্ন অংশে ঢালাইয়ের কাজ অত্যন্ত নিম্নমানেরভাবে করা হচ্ছে। অনেক স্থানে যেখানে ৩ ইঞ্চি পুরুত্বে ঢালাই দেওয়ার কথা, সেখানে বাস্তবে দেড় থেকে ২ ইঞ্চির বেশি পাওয়া যায়নি। কয়েকদিন আগের ঢালাইয়ের অংশেও কংক্রিট শক্ত না হওয়ায় সহজেই পাথর উঠে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজে নিম্নমানের সিমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে।
ওই এলাকার বাসিন্দা তোজাম্মেল ইসলাম বলেন, কি যে কাজ হচ্ছে, সিমেন্টের নাম কেউ জানে না। এখনই পাথর খুলে খুলে যাচ্ছে। কয়দিন টিকবে এই ক্যানেল?
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মো. জাফরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, “ঢালাই দেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে পাথর বের হয়ে গেছে এবং ফাটল দেখা দিয়েছে।
এছাড়া ক্যানেলের পাশ দিয়ে ভারী যানবাহনে পাথর, বালু ও সিমেন্ট পরিবহনের কারণে বিভিন্ন স্থানে ক্যানেলের পাড় ভেঙে গেছে।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পে কর্মরত ওয়ারেজ নামের এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হলে তিনি দাবি করেন, “কাজ সঠিক নিয়মেই হচ্ছে।” তিনি জানান, “এখানে ১০ বস্তা পাথর ও ১০ বস্তা বালুর সঙ্গে ১ বস্তা সিমেন্ট মিশিয়ে ৩ ইঞ্চি পুরুত্বে ঢালাই দেওয়া হচ্ছে।
তবে সরেজমিনে বাস্তব চিত্রে তার বক্তব্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর প্রায় দুই ঘণ্টা পর ওই কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত হন। এ সময় তিনি দাবি করেন, পাশের এলাকায় আত্মীয়ের বাড়িতে দাওয়াতে গিয়েছিলেন।
পরে প্রকল্পের নথিপত্র দেখতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, সব কাগজপত্র অফিসে রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাকে যেভাবে কাজ করতে বলেছে, সেভাবেই করছি।” এ সময় সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে ঠিকাদারের লোকজন কাজ বন্ধ করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই ক্যানেলের কাজ চলছে। এখানে নানা ধরনের অনিয়ম হচ্ছে। আমরা প্রতিবাদ করতে গেলে এলাকার কিছু আওয়ামী লীগ নেতা আমাদের হুমকি দেয়। তারা বলে, এ বিষয়ে কোনো কথা বলা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, এলাকার কিছু সুবিধাবাদী মানুষ প্রতিদিন টাকার বিনিময়ে ঠিকাদারদের সহযোগিতা করছে। যখনই আমরা অনিয়মের কথা বলি, তখনই তারা আমাদের ওপর চড়াও হয়।
এলাকার আরও কয়েকজন বাসিন্দা জানান, তারা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। অনিয়ম দেখলেও ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না। প্রতিবাদ করলে নানা ধরনের হুমকি ও চাপের মুখে পড়তে হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি তার জানা নেই। এমনকি প্রকল্পে কর্মরত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নামও তিনি নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত এই নির্মাণকাজের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। পাশাপাশি নিম্নমানের কাজ বন্ধ করে সরকারি নিয়ম মেনে পুনরায় কাজ সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আজকালের কন্ঠ/আর বি