Header
প্রিন্ট তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ , ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ | প্রকাশের সময়ঃ এপ্রিল ২৩, ২০২৬ , ৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ

ন্যায়বিচার; আইন, মানবিকতা ও আদালতের দায়িত্ব: নাসির মজুমদার

লেখকঃ নিজস্ব প্রতিবেদক

সম্প্রতি এক যুব মহিলা লীগ নেত্রীকে দেড় মাস বয়সী সন্তানসহ কারাগারে নেওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে মানবিক বিবেচনায় আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেছেন। এই ঘটনাটি আবারও আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—ন্যায়বিচার কি কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগ, নাকি এর সঙ্গে মানবিক বোধেরও সমন্বয় থাকা জরুরি?

আইনের শাসন একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। কিন্তু সেই আইনের প্রয়োগ যদি মানবিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে তা কখনোই প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। আবার, শুধুমাত্র আবেগ বা সহানুভূতির ভিত্তিতে আইনকে উপেক্ষা করাও সমানভাবে বিপজ্জনক। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই বিচার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনেক সময় বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ অতিরিক্ত সুবিধা পাচ্ছে কি না, কিংবা অন্যদিকে কেউ হয়রানির শিকার হচ্ছে কি না—এই সংশয় সমাজে আস্থার সংকট তৈরি করে। অথচ একটি সুস্থ বিচার ব্যবস্থার প্রথম শর্তই হলো—আইনের চোখে সবাই সমান।

এখানেই আসে আদালতের ভূমিকা।

একটি দায়িত্বশীল আদালত কেবল আইনের অক্ষর মেনে চলে না, বরং আইনের চেতনাকেও ধারণ করে। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে মানবিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনা করা আদালতের দুর্বলতা নয়—বরং সেটিই একটি পরিপক্ব বিচারব্যবস্থার পরিচায়ক। একটি নবজাতক শিশুর অধিকার, একজন মায়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা—এসব বিষয় উপেক্ষা করে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগ করলে সেটি ন্যায়বিচার নয়, বরং যান্ত্রিক বিচার হয়ে দাঁড়ায়।

তবে একই সঙ্গে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন—মানবিকতা কখনোই অপরাধের বিকল্প হতে পারে না। “অপরাধকে ঘৃণা করা, অপরাধীকে নয়”—এই নৈতিক অবস্থান সমাজকে মানবিক করে তোলে, কিন্তু আইনের বিচারে অপরাধের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই হবে। আইনের সামনে কারো পরিচয়, ক্ষমতা বা প্রভাব কোনোভাবেই বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়।

সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন বিচার প্রক্রিয়ায় দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ ওঠে। একজন সাধারণ নাগরিক যেখানে দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটান, সেখানে অন্য কেউ দ্রুত জামিন পেয়ে যান—এই বৈষম্য যদি দৃশ্যমান হয়, তাহলে জনগণের আস্থা নষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক। তাই বিচার ব্যবস্থার প্রতিটি পদক্ষেপে স্বচ্ছতা, সামঞ্জস্য ও যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা থাকা জরুরি।

আমাদের বিচারব্যবস্থার সামনে আজ তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট—

প্রথমত, নিরপেক্ষতা—আইনের প্রয়োগে কোনো প্রকার রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব যেন কাজ না করে।

দ্বিতীয়ত, মানবিকতা—বিচারের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি ও মানবিক দিক বিবেচনায় নেওয়া।

তৃতীয়ত, সামঞ্জস্য—একই ধরনের ঘটনায় একই ধরনের আচরণ নিশ্চিত করা।

এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলেই বিচারব্যবস্থা জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে।

আদালত কেবল রায় দেয় না—আদালত একটি সমাজের নৈতিক অবস্থানও নির্ধারণ করে। একটি মানবিক, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক বিচারব্যবস্থা একটি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যায়; আর পক্ষপাতদুষ্ট বা অস্বচ্ছ বিচারব্যবস্থা সেই রাষ্ট্রকে পিছিয়ে দেয়।

আজকের প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রয়োজন এমন একটি বিচারব্যবস্থা, যেখানে আইন কঠোর হবে, কিন্তু অমানবিক হবে না; মানবিকতা থাকবে, কিন্তু তা যেন কখনোই ন্যায়বিচারকে ক্ষুণ্ণ না করে।

কারণ শেষ পর্যন্ত, ন্যায়বিচার শুধু আদালতের ভেতরে প্রতিষ্ঠিত হয় না—এটি প্রতিষ্ঠিত হয় মানুষের মনে।

প্রিন্ট করুন