কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া আবহমান বাংলার শোলা শিল্পকে পরম মমতায় সজীব রেখেছেন কুষ্টিয়ার কারুশিল্পী গোপেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই আপন খেয়ালে গড়া তার শিল্পকর্ম দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কুড়িয়েছে সম্মান। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং আধুনিকতার আগ্রাসনে এই লোকশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চরম শঙ্কিত। তার আশঙ্কা, বাঙালির এই শেকড়সংলগ্ন শিল্প হয়তো তার সঙ্গেই চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে বাংলা নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে তার শিল্পকর্মের প্রদর্শনীতে এক সাক্ষাৎকারে এমন অনুভূতির প্রকাশ করেন তিনি।
শুভ্র শোলার নিপুণ বুননে তিনি কেবল শোপিস বা নকশাই গড়েন না, বরং জীবন্ত করে তোলেন শেকড়ভোলা বাঙালির হারিয়ে যাওয়া আত্মপরিচয়। আধুনিকতার যান্ত্রিক চাকায় পিষ্ট হয়ে ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতি। অথচ এই মৃতপ্রায় ঐতিহ্যের বুকেই পরম মমতায় প্রাণসঞ্চার করে চলেছেন কিছু নিভৃতচারী কারিগর। এমনই এক অনন্য রূপকার কুষ্টিয়া জেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের আড়পাড়া গ্রামের সন্তান গোপেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।
তার এই শিল্পযাত্রার সূচনা বেশ আকস্মিক। ঢাকার আদর্শ কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে চাকরির সময়কার মাইক্রোস্কোপের নিচে স্পঞ্জজাতীয় শোলা ব্লেড দিয়ে কাটার সময় তার মনে উঁকি দেয় শিল্পসৃষ্টির অভিনব ভাবনা। কোনো ওস্তাদের তালিম ছাড়াই সম্পূর্ণ আপন খেয়ালে শুরু হয় তার এই জাদুকরী পথচলা।
পরবর্তীতে ঢাকা কৃষি গবেষণায় কর্মরত অবস্থাতেও তিনি শিল্পের সাধনা অব্যাহত রাখেন। তার নিপুণ হাতের ছোঁয়া বিসিক, শিল্পকলা ও চারুকলার মতো প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছে অকুণ্ঠ প্রশংসা এবং অন্তত পঁচিশটি সম্মাননা। সরকারি পৃষ্ঠাপোষকতায় তিনি জাপান ও চীনেও নিজের শিল্পের প্রদর্শনী করেছেন। গত বছর চীনে ২৮টি দেশের অংশগ্রহণে আয়োজিত এক মেলায় তার তৈরি শোলার পাখা প্রথম স্থান অধিকার করে। ভিসা জটিলতায় নিজে উপস্থিত থাকতে না পারলেও তার পাঠানো শিল্পকর্মটি বিশ্বমঞ্চে বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেছে, ছিনিয়ে এনেছে সেরার স্বীকৃতি।
তবে প্রাপ্তির এই বর্ণিল অধ্যায়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর আক্ষেপ। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প বা বেতের কাজের মতো শোলার কাজও আজ ক্রেতার অভাবে ধুঁকছে। শিল্পীদের জীবনধারণ আজ কঠিন হয়ে পড়েছে। মন্ত্রিপরিষদসহ বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ে তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন ঢাকার বিমানবন্দর সংলগ্ন খালি জায়গায় কারুশিল্পীদের জন্য একটি স্থায়ী মার্কেট ও পল্লি নির্মাণের, যাতে তারা সেখানে বসবাস ও কাজ করে সরকারকে কর দিতে পারেন। কিন্তু সেই প্রস্তাব আলোর মুখ দেখেনি।
এ সময় তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমি জানি যে বাংলাদেশের এ জিনিস আর ধরা থাকবে না। এখন দেখেন গা, লেখাপড়া বাদ দিয়েও ওই যে মোবাইল পেয়েছে, এই মোবাইলেই দেশ খেয়ে দিলো।
ওই যে, আপনার, মানুষের ব্যবহার নেই। আমার আপনি যদি না কেনেন, তাহলে তো আমার পয়সা আসবে না। আর আমার উৎসাহ বাড়বে না। আমার ছেলে, প্রথম প্রথম শিখছিল। আমার কাছ থেকেই শিখে অনেক কিছু করেছে। কিন্তু পরে বলছে যে বাবা এই করে কি পেট চলবে? বললাম আরে না তুই পড়। ডিগ্রি পাশ করলো, আমি রিটায়ার্ড হয়ে যাচ্ছি, দরখাস্ত জমা দিলাম। আমার স্যার বলছে যে আপনি চলে যাচ্ছেন, আপনার ছেলেপিলে নেই? আমি বললাম স্যার ছেলে একটাই আছে। তো এইরকম, তো বলছে যে তাকে ফোন দেন, সে আসুক। গেলি পরের দিনই আমার ছেলেরে চাকরি দিয়ে আমারে বিদায় দিলো। এখনো আমি গেলি চেয়ারম্যান সাহেব আমাকে জড়িয়ে ধরে।
তারা এখন টেকনিক্যাল পথ। না আর কোনো আশা নেই আমার। তার কারণ, এই যে জিনিস আমি পেটে করে আমার পেটের থেকে বেরিয়েছে আবার আমার পেটে করেই চলে যাবে।
বাঙালির সংস্কৃতি, বাঙালিই নেই এখন। বাঙালি কিডা? বাঙালি কিডা বলেন? বাঙালিই তো নেই। বাঙালি বাংলা ভাষা জানেনা। হ্যাঁ, এখন ডিগ্রি পাশ ছেলেকে একটা বলেন তো যে মার কাছে একটা চিঠি লেখুক। আমি এখানে গ্যারান্টি। যদি সাধু ভাষায় মার কাছে একখান চিঠি লিখে দিতে পারে, তো আমি তাকে ৫০০ টাকার মিষ্টি খাওয়াবো। এমন ছাত্র নেই যে মার কাছে একখান চিঠি লেখে সেইরকম। ওই হ্যাঁ পারবে কারা? ওই যারা বাংলায় পড়ছে, বাংলা নিয়ে পড়ছে, তারাই পারবে।”
আজকালের কন্ঠ/আর বি